সংবাদদাতা, রামপুরহাট: বীরভূম জেলার বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রাজস্ব আদায় আরও বাড়ানো এবং সমস্ত বেআইনি কারবারকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনাই এখন রাজ্য সরকারের মূল লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যে জেলার সমস্ত অবৈধ পাথর খাদান ও বালিঘাটকে সরকারি নিয়ম মেনে আবেদন জানানোর এবং দ্রুত টেন্ডার ডাকার কড়া নির্দেশ দিলেন রাজ্যের ভূমি ও ভূমি সংস্কার এবং উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর জানা।
শুক্রবার নলহাটির নলাটেশ্বরী মন্দিরে পুজো দিতে আসেন মন্ত্রী। মন্দিরে তাঁকে স্বাগত জানান বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য তথা নলহাটি পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বিপ্লব ওঝা, সেন্টু ঘোষ প্রমুখ। পুজো দিয়ে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মন্ত্রী বলেন, বীরভূম জেলা হল ‘সোনার ভূমি’। বালি, কয়লা ও পাথর, সব মিলিয়ে এটি একটি অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক জোন। অতীতে ৩৪ বছর ও পরবর্তীতে ১৫ বছরের সরকারের আমলে এখানকার বিপুল রাজস্ব পকেটমানি ও কাটমানির রাজনীতিতে হাওয়া হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে পুরো অর্থই সরাসরি সরকারি রাজস্ব খাতে জমা হচ্ছে। সরকারের এই কড়া নজরদারির ফলেই গত ২৫-২৬ অর্থবর্ষে যে রাজস্ব এসেছে, ২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম পাঁচ মাসেই তা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বীরভূমের পাথর শিল্পাঞ্চলের অবৈধ কারবার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট জানান, জেলায় বর্তমানে মোট ২৭৩ পাথর খাদানের মধ্যে মাত্র ৭৩টি বৈধ এবং বাকি ২০০ অবৈধ। এই বেআইনি খাদান ও অবৈধ বালিঘাটগুলিকে আইনসিদ্ধ করে টেন্ডার ডাকার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিল্প সম্ভাবনা ও উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী আরও যোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী রাজ্যজুড়ে শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা চলছে এবং ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন শিল্পপতি বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আগামী দিনে এতে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের বেহাল রাস্তাঘাট সংস্কার এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক পরিচালনার দিকে সরকারের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে।
তবে প্রতিমন্ত্রীর এই পদক্ষেপের মাঝেই উঠছে কিছু বাস্তব চিত্র। ২০১৭ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালত বীরভূম জেলার ২১৭টি পাথর খাদানের মধ্যে ২১১ অবৈধ ঘোষণা করে অবিলম্বে উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু ন’ বছর অতিক্রান্ত হলেও আদালতের সেই আদেশ কেবল কাগজে-কলমেই রয়ে গিয়েছে। অভিযোগ, বীরভূমের বিস্তীর্ণ এলাকায় রমরমিয়ে চলছে এই বেআইনি কারবার, পরিবেশ দপ্তরের কোনো বৈধ ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে হাজার হাজার পাথর ক্র্যাশার। আগে খাদান থেকে পাথর তোলার ক্ষেত্রে টন প্রতি রয়্যালটির টাকা আগেই জমা করতে হতো মাইন্স ডিপার্টমেন্টে। অধিকাংশ খাদান অবৈধ ঘোষণা হওয়ায় বৈধ রয়্যালটি নিতে পারছে না সরকার। তৃণমূল আমলে পাথর শিল্পাঞ্চলের রাস্তায় ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের গেটে ‘ডিসিআর’(ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিট) কাটলেই অবৈধ পাথর বৈধ হয়ে এসেছে। যা বিজেপির আমলেও বহাল রয়েছে।
সম্প্রতি ‘টুলু মণ্ডল কাণ্ড’-এর পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে এবং গত ৩১ জুলাই জেলার ৮টি বেআইনি খাদান বন্ধ করে দেওয়া হলেও রামপুরহাটের নুড়াইতলার মতো কিছু এলাকায় এখনও ‘অদৃশ্য সেটিং’ বলে অবৈধ পাথর খাদান চলেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এই পরিস্থিতিতে মন্ত্রীর টেন্ডার ডাকার এই নির্দেশ কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেই নজর বীরভূমবাসীর।



