


রাহুল চক্রবর্তী ও শ্যামলেন্দু গোস্বামী: কলকাতা ও বারাসত: দমদমের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পড়ুয়া রিভু মিত্র। বাড়ি হলদিয়ায়। ভাড়া থাকেন বিমানবন্দর সংলগ্ন একটি বহুতলের টপ ফ্লোরে। প্রতিদিনই হলদিয়া থেকে বাবা-মা কম করে দু’-তিনবার ফোন করেন ছেলেকে। আমেদাবাদের বিমান বিপর্যয় তাঁদের ঘুম একপ্রকার উড়িয়ে দিয়েছে। ছেলের সঙ্গে কথা বলার সময় বিমান ওঠানামার শব্দ পান। প্রবীণ দম্পতি বারবারই বলেন, ‘এয়ারপোর্টের কাছাকাছি ফ্ল্যাট না নিলেই হতো না?’ তারপর আশঙ্কায় গলা ভার হয়ে আসে দুই প্রবীণের। বলেন, ‘প্রতিবার প্লেনের শব্দ পাই আর বুক কেঁপে ওঠে।’
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশ ঘন জনবসতিপূর্ণ। এয়ারপোর্ট এক নম্বর, কৈখালি, চিনার পার্ক, রাজারহাট, বিরাটি, মাইকেলনগর, নিউ বারাকপুরে বহুতলের পর বহুতল। হোটেল, রেস্তরাঁ, দোকান। একতলা-দোতলা বসতবাড়ির ছড়াছড়ি। ২৪ ঘণ্টাই গাড়ি চলে রাস্তায়। সুমন বন্দ্যোপাধ্যায় নামে মাইকেলনগরের এক বাসিন্দা বলেন, ‘প্লেনের আওয়াজ আমাদের পরিচিত। কিন্তু আমেদাবাদের বিমান দুর্ঘটনার পর এই শব্দই আতঙ্ক। সবসময় যেন ভয়ে ভয়ে কাটছে।’
ভয়ানক বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে সর্বত্র। কারণ খোঁজার চেষ্টা চলছে। বিমানটিকে কোনও জলাশয় বা খোলা জায়গায় নিয়ে যাওয়া কি সম্ভব ছিল? বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, সেই সুযোগ পাইলটের কাছে ছিল না। কারণ বিমানবন্দরের আশপাশে ঘন জনবসতি। ফলে বিমান ভেঙে পড়ে হস্টেলের উপর। মৃত্যুর মিছিল। এই পরিস্থিতিতেই আলোচনায় উঠে আসছে কলকাতা বিমানবন্দর। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যে জায়গায় অবস্থান করে তার চৌহদ্দিজুড়ে শুধুই ঘন জনবসতি। বিমানবন্দরের সীমানা ছাড়ানোর পর কোনওদিকে কোনও ফাঁকা জমি বা জলাশয় নেই। ফলে রওনা হওয়ার পর কোনও অঘটন পরিস্থিতির মুখে পড়লে বিমান নামানো কার্যত অসম্ভব। আমেদাবাদ দুর্ঘটনার পর মৃত্যুর পরিসংখ্যান বুক কাঁপাচ্ছে এই এলাকার বাসিন্দাদেরও। প্রাক্তন বিমান চালকদের কপালেও এ বিষয়ে চিন্তার ভাঁজ।
অবসরপ্রাপ্ত পাইলট সুমন্ত রায়চৌধুরী বলেন, ‘বিমানবন্দরের আশপাশজুড়ে কংক্রিটের জঙ্গল প্রত্যেকদিনের থ্রেট। বিমানবন্দরের আশপাশে চাষের জমি ছাড়া কিছু থাকা উচিত নয়। কিন্তু কলকাতার বিমানবন্দরের পাশে ফাঁকা জমি, জলাশয় নেই। এটি নিঃসন্দেহে চিন্তার কারণ। খেয়াল রাখতে হবে নতুন কোনও বহুতল যেন গজিয়ে না ওঠে। আর যেগুলি রয়েছে সেগুলি সম্পর্কে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নিক।’ অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যান্টেন শুভাগত জোয়ারদার বলেন, কলকাতা বিমানবন্দরের আশপাশে ঘন জনবসতি অত্যন্ত চিন্তার কারণ। বিমানবন্দরের সামনে কিংবা পিছনের অংশে ফাঁকা জায়গা নেই। ফলে আগামী দিনের জন্য অশনি সঙ্কেত। প্রশাসনকেই ভাবতে হবে করণীয় কি?’ এর পাশাপাশি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে কাজ করা অভিজ্ঞ আধিকারিকরা বলেন, ‘কলকাতা বিমানবন্দরের আশপাশে বহুতলগুলি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। যদি কোনওদিন তড়িঘড়ি বিমান নামাতে হয় তাহলে ওই কংক্রিটের জঙ্গলের উপর আছড়ে পড়তে পারে। ফলে প্রচুর প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।’