সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ‘চেন-ম্যান’ কামরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন জেলা পুলিশের তাবড় কর্তারা। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই অপরাধের ধরণ বদলায়। অপরাধী বদলায়। বদলে যায় খুনের মোটিভও। কামরুজ্জামান ছিল ‘নেক্রোফিলিক’। সুন্দরী মহিলাদের মেরে মৃতদেহের সঙ্গে সহবাস করাই ছিল তার নেশা। সাম্প্রতিক সময়ে বর্ধমানে যে কয়েকটি দেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে মহিলার সংখ্যাই বেশি। কিন্তু কেন তাঁদের খুন করা হচ্ছে, কে-ই বা করছে—এ সবকিছুই থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে! অথচ, খুন করার পর দেহটি ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ করে তোলার কৌশলটা একই।
বছর কয়েক আগে পাঁচ মাসের ব্যবধানে জোড়া যুবতীর দেহ উদ্ধার ঘিরে তোলপাড় পড়েছিল দামোদরের পাড়ে। একটি দেহ ভাসতে ভাসতে আসে জামালপুর থানা এলাকায়। অন্যটি বর্ধমানে। দেহ দু’টি উদ্ধারের পর পুলিশের পর্যবেক্ষণ, খুনের পর যুবতীদের পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে মুখমণ্ডলে বেশি পরিমাণ পেট্রোল বা কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে ছারখার করে দিয়েছিল খুনিরা। তারপর তারা ভাসিয়ে দেয় দামোদরের জলে। দেহ দু’টি উদ্ধার করে বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ। তদন্ত সেখানেই থমকে। ২০২১ সালের পয়লা জুলাই এবং ৭ নভেম্বর দেহ দু’টি উদ্ধার হয়। পাঁচ বছর পরও খুনিরা অধরা। সেই নৃশংস কায়দায় সম্প্রতি আরও কয়েকজনকে খুন করে দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে নদীতে। ফল যা হওয়ার তাই। ‘বেওয়ারিশ লাশ’ হয়ে পড়ে মর্গে! বড় ব্রেক থ্রু করতে পারছেন না তদন্তকারীরা।
দামোদরের পাড় লাগোয়া বর্ধমানের বেলকাশ পঞ্চায়েত এলাকা। সবুজ-স্নিগ্ধ সমনোরম পরিবেশ। নদের দু’পাড় বরাবর চাষ জমি। একুশ সালের পয়লা জুলাই প্রতিদিনের মতো মাঠে কাজে গিয়েছিলেন কয়েকজন চাষি। তাঁদের একজন আচমকা দেখতে পান নদের পাড়ে এক যুবতীর দেহ পড়ে। মুখটা সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মুখে গুঁজে দেওয়া হয়েছে অন্তর্বাস। দেহের পাশেই একটা দেশলাইয়ের বাক্স এবং একটি জার পড়েছিল। তাঁরা তড়িঘড়ি বর্ধমান থানায় খবর দেন। স্থানীয়রা মোটামুটি নিশ্চিত, ওই যুবতীকে বাইরে থেকে এনে খুন করা হয়েছে। জোরকদমে তদন্তে নামে পুলিশ। খুনের কিনারা করার আগেই জামালপুরের হয়বতপুরে দামোদরের পাড়ে অর্ধনগ্ন এক যুবতীকে আগুনে পুড়তে দেখেন। ততক্ষণে দেহের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুড়ে গিয়েছে। ঘটনাস্থলে দেশলাই বাক্স এবং পেট্রলের জারও উদ্ধার হয়। ঠিক যেভাবে বেলকাশ পঞ্চায়েত এলাকায় যুবতীর দেহের পাশ থেকে উদ্ধার হয়েছিল।
দু’টি ঘটনার সঙ্গে সূত্র সমন্বয় করে তদন্তে গতি আনতে চেয়েছিলেন তদন্তকারীরা। রাজ্যের প্রতিটি থানায় ছবি পাঠিয়ে দুই যুবতীর পরিচয় জানার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু, পাঁচ বছর পরও পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি। দুই যুবতীকে একজন খুন করেছিল কি না, সেটাও রহস্যে থেকে গিয়েছে। পুলিশের এক আধিকারিক বলছিলেন, দুই যুবতীকে এভাবে নৃশংস হত্যা একজনই করেছিল কি না, সেটা তদন্ত সাপেক্ষ। তবে, অপরাধীরা বেশ ভালো করেই জানে মুখমণ্ডল বিকৃত করে দিতে পারলে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। তাই, খুনের পর দেহটিকে ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ করে তুলতে অপরাধীরা একে অপরকে অনুসরণ করে।
তবে এটাও ঠিক, ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ দেহ উদ্ধার হলেই যে খুনিরা পার পেয়ে যাবে এমনটা নয়। অনেক সময় দেখা গিয়েছে, বেশ কয়েক বছর পরও কোনো না কোনো ক্লু একটা পাওয়া যাবেই। সেটার সূত্র ধরেই আততায়ীদের জালে তোলা সম্ভব হয়।



