উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম দোর্দণ্ডপ্রতাপ যোদ্ধা বীর চিলারায়। এটি তাঁর আসল নাম নয়। কোচবিহারের কামতা বা বেহার রাজবংশের মহারাজা নরনারায়ণের ভাইয়ের আসল নাম শুক্লধ্বজ। তবে ‘বীর চিলারায়’ নামে তিনি বেশি পরিচিত। নরনারায়ণের রাজ্যাভিষেকে শুক্লধ্বজকে ‘সংগ্রাম সিংহ’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। দাদা নরনারায়ণ স্বয়ং তা দিয়েছিলেন। চিলারায়কে নিয়ে বহু গল্প লোকের মুখে ফেরে। তিনি নাকি ঘোড়ার পিঠে চেপে চিলার (চিল) মতো বেগে শত্রুপক্ষকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যেতে পারতেন। জল হোক বা স্থল—যে কোনও যুদ্ধেই প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করতে তাঁর জুড়ি ছিল না। শুক্লধ্বজের সেনাপতিত্বে রাজা নরনারায়ণ বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। মুঘল শক্তিও বেশ কয়েকবার প্রতিহত হয়েছিল তাঁদের সামরিক শৌর্যের কাছে। অসম, মণিপুর, ত্রিপুরা, শ্রীহট্ট, কাছাড়, খাইরম সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক রাজাকে হারিয়ে বৃহত্তর কোচ সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটেছিল তাঁর বীরত্বের সুবাদে। এমনকী, ভুটান রাজার সৈন্যদেরও পরাজিত করেন তিনি। ইতিহাস বলে, সপ্তদশ শতাব্দীতে শিবাজি ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে নেপোলিয়ন গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে সফল হয়েছিলেন। তার আগেই ষোড়শ শতাব্দীতে ওই কৌশলেই যুদ্ধ করে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিলেন চিলারায়। প্রবল প্রতাপশালী চিলারায়ের আমলে কামতা সাম্রাজ্য বিশাল আকার নেয়। সেই সময়ের অখণ্ড কোচ কামতা রাজ্য বর্তমানে অসম, ত্রিপুরা, বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। যোদ্ধা চিলারায়ের শাস্ত্রজ্ঞানও ছিল অগাধ। বারাণসীতে দাদা নরনারায়ণ ও শুক্লধ্বজ একসঙ্গে শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। কোচবিহারে ফিরে দাদাকে সিংহাসনে বসিয়ে কার্যত নিজেই রাজ্য পরিচালনার ভার কাঁধে তুলে নেন। ভাইয়ের সেনাপতিত্বে নিশ্চিন্ত ছিলেন নরনারায়ণও। রাজ্য পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্য-সংস্কৃতিরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নরনারায়ণ-ভ্রাতা। অসমের কামাখ্যা মন্দির পুনর্নিমাণ করেন তিনি। শঙ্কর দেবের বৈষ্ণব আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছিলেন চিলারায়। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই কোচবিহারে মদনমোহন মন্দির নির্মাণ হয়। এই মদনমোহন মন্দিরের রাসমেলা উত্তরবঙ্গের মেলাগুলির মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য।



