


বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: করোনাকালে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে একগুচ্ছ প্রকল্প ঘোষণা করেছিল মোদি সরকার। তারই গালভরা নাম ‘আত্মনির্ভর ভারত’। ২০২০ সালের মে মাসে ঘোষণা করা সেই প্রকল্পগুলির একটি ছিল ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের বিস্তার। ঘোষিত লক্ষ্য? কর্মসংস্থান। কেন্দ্র জানিয়েছিল, মোট ৫০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হচ্ছে। সেখান থেকে মূলধন জুটিয়ে ব্যবসা চালু করতে পারবে যে কোনও ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থা। যত বেশি উদ্যোগ গড়ে উঠবে, তত বেশি খুলবে কর্মসংস্থানের পথ। এই ছিল প্রচারের সম্পূর্ণ চিত্রনাট্য। এই প্রকল্পে ৫০ হাজার কোটি টাকার তহবিল। তার মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রের। বাকি ৪০ হাজার কোটি আসবে কোনও বেসরকারি মূলধন সরবরাহকারী (ভেঞ্চার ক্যাপিটাল) সংস্থার তরফে। সহজ হিসেবটি হল, কোনও নতুন ব্যবসা বা উদ্যোগে যদি সরকার নিজের তহবিল থেকে ২০ শতাংশ দেয়, তাহলে বাদবাকি ৮০ শতাংশ আসবে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে। পাঁচ বছর পেরিয়ে যাওয়া সেই তহবিলের বর্তমান পরিস্থিতিটা কী? সূত্রের খবর, ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা খরচ করতে পেরেছে কেন্দ্র। অর্থাৎ পাঁচ বছর পেরিয়ে বেশি সময়ে তারা তহবিলের ১৫ শতাংশও খরচ করতে পারেনি। আর মূলধন জোগানকারী বেসরকারি সংস্থার তরফে খরচ হয়েছে ১১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মোট ৫০ হাজার কোটির তহবিলে কাজে লেগেছে মাত্র ১২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। এই হাড়ির হালে আরও কঠিন জায়গায় পড়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। গোটা দেশে যখন ৬০৯টি সংস্থা এই সরকারি সুবিধা পেয়েছে, সেখানে বাংলায় সংখ্যাটা আটকে গিয়েছে মাত্র ছ’টিতে! বছরে ২ কোটি চাকরি, ইনসেন্টিভ স্কিম বা হালে লালকেল্লা থেকে ঘোষিত ওই প্রকল্পেরই নয়া মোড়ক ‘প্রধানমন্ত্রী বিকশিত ভারত রোজগার যোজনা’—কর্মসংস্থান যে শুধু প্রতিশ্রুতির আলোকেই আলোকিত, তা পরিসংখ্যানই বলছে। আর এই ধারাটা বেসরকারি এমএসএমই’র ক্ষেত্রেও অব্যাহত।
অথচ, ছোট শিল্পের বেসরকারি পুঁজি পেতে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ইতিমধ্যেই চুক্তি করেছে ৬৪টি মূলধন সরবরাহকারী সংস্থা। তারা তহবিলে টাকাও ঢেলেছে। অর্থাৎ কোনও উদ্যোগপতির ব্যবসা চালুর ক্ষেত্রে মূলধন সংক্রান্ত সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাহলে যে আত্মনির্ভর ভারতের কথা কেন্দ্রীয় সরকার বারবার ঢাক পিটিয়ে বলে, কেন তার এমন দুরবস্থা? এর জন্য বিভাগীয় কর্তারা দুষছেন মূলত দু’টি কারণকে। প্রথমত, কেন্দ্রের ওই প্রকল্পটি নিয়ে তেমন প্রচার নেই। দ্বিতীয়ত, যাঁরা আবেদন করেছেন, শর্তের গেরো ও প্রশাসনিক জটিলতায় তাঁদের অনেকেরই আর্জি আটকে গিয়েছে। তাতেই প্রশ্ন উঠছে, সরকার প্রকল্প চালুর কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করলেও, তার বাস্তব রূপ দিতে তারা আদৌ কি সচেষ্ট?
দপ্তরের কর্তারা জানাচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গের যে ছ’টি সংস্থা ওই তহবিল থেকে ব্যবসা চালু করেছে, তাদের মধ্যে তিনটি কলকাতার। বাকি তিনটি জেলাভিত্তিক। ছ’টির মধ্যে চারটি সংস্থা ক্ষুদ্র শিল্প। বাকি দু’টি মাঝারি। তবে পূর্বাঞ্চলের অন্য রাজ্যগুলির পরিস্থিতিও করুণ, বলছেন কর্তারা। বিহারে মাত্র দু’টি সংস্থা সরকারি সুবিধা পেয়েছে। ওড়িশায় সুবিধা পাওয়া সংস্থার সংখ্যা মাত্র ৯। ঝাড়খণ্ডে সেই সংখ্যা গত পাঁচ বছরে মাত্র ১! রাজ্যের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি দপ্তরের মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহার কথায়, ‘কেন্দ্রীয় সরকার নিজেদের প্রকল্পগুলির শুধু গালভরা প্রচারই করে থাকে। বাস্তবে তার সাফল্যের ছিটেফোঁটাও চোখে পড়ে না। অথচ এরাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আনা প্রতিটি প্রকল্প অত্যন্ত সফল, তা প্রত্যেকেই জানেন।’