অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: রাজ্যে পালাবদলের পাঁচ মাসও পেরোয়নি। তার মধ্যেই নদীয়া উত্তরে শাসকদল বিজেপির অন্দরের মতানৈক্য ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। পঞ্চায়েতের দখল, প্রধান-উপপ্রধান নির্বাচন থেকে শুরু করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত—বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে নিচুতলার নেতা-কর্মীদের একাংশের ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে আসছে। কখনও সমাজমাধ্যমে দলের নেতৃত্বকে নিশানা করে সরব হচ্ছেন নেতারা, কখনও আবার পঞ্চায়েতের বোর্ড গঠনকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে টানাপোড়েন।
দলীয় সূত্রে খবর, পঞ্চায়েতের ক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বিভিন্ন পদে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোকে কেন্দ্র করেই একাধিক জায়গায় বিবাদ তৈরি হচ্ছে। দলের ভিতরে এই মতানৈক্যে তিতিবিরক্ত নিচুতলার কর্মীরা। ফলে, আগামীদিনে সংগঠনের ভিত আরও মজবুত করতে বুথভিত্তিক বৈঠক এবং নিয়মিত সাংগঠনিক পর্যালোচনার উপর জোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খুব শীঘ্রই বিধানসভা ভিত্তিক কমিটি তৈরির প্রক্রিয়াও শুরু হবে।
সম্প্রতি নদীয়া উত্তরের বিজেপি জেলা কার্যালয়ে দলের জেলা ইনচার্জ ফাল্গুনী পাত্র এবং বিভাগ কনভেনাররা আসেন। সেখানে জেলা নেতৃত্ব ও বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে নিচুতলা থেকে উপরতলা পর্যন্ত সমন্বয় বাড়ানোর উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। নদীয়া উত্তরের বিজেপি সভাপতি অর্জুন বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের জেলায় ইনচার্জ, বিভাগ কনভেনাররা এসেছিলেন। নেতৃত্বদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। এবার পুরোপুরি সংগঠনের দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে। বুথস্তর পর্যন্ত সংগঠন তৈরি করা হবে। বুথে বুথে বৈঠক হবে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আরও নিবিড় করতে হবে। প্রতি মাসে নিচুতলা থেকে উপরতলা পর্যন্ত বৈঠক করে সকল কর্মীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে।’
তাতেও কাজের কাজ কতখানি হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে কয়েকটি ঘটনা। চাপড়ার হাটখোলা পঞ্চায়েতের উপপ্রধানের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভেস্তে যাওয়া নিয়ে সমাজমাধ্যমে সরব হন সদ্য বিধানসভা নির্বাচনে চাপড়ার বিজেপি প্রার্থী তথা জেলা কমিটির সদস্য সৈকত সরকার। তিনি পোস্ট করে দলকে কাঠগড়ায় তুলে লেখেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা জেবের শেখের দালালি করার জন্য বিজেপির কোন কোন নেতা কত টাকা ডিল করেছে, জানা দরকার।’ আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়িয়ে তিনি এও বলেন, ‘বিজেপির এক নেতা হৃদয়পুরে জমি কিনছেন, সেটা কি জেবের শেখের টাকায় কেনা হচ্ছে? সোনা পাচারকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভালোই চলছে কামানো।’ যদিও এই নিয়ে জেলা সভাপতি বলেন, ‘হাটখোলা পঞ্চায়েতে আমরা অনাস্থা আনিনি, কাউকে সমর্থনও করিনি। কারণ ওটা তৃণমূল ও তৃণমূলের দ্বন্দ্ব। কেউ ভুল বললে তাঁর দায়িত্ব আমি নেব না।’
এর আগে কৃষ্ণনগর-২ ব্লকের সাধনপাড়া-২ পঞ্চায়েতের নির্দল প্রধান পদত্যাগের পর প্রধান নির্বাচন ঘিরে বিজেপির অন্দরে মতবিরোধ তৈরি হয়। স্থানীয় নেতৃত্বের দাবি ছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে বিরোধীদের সমর্থনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের দুই ও বিজেপির তিন সদস্যের সমর্থনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এক সদস্য প্রধান হন। অভিযোগ, বিজেপির সদস্যদেরই প্রধান নির্বাচনের সভায় ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। ঘটনায় পঞ্চায়েত দখল ঘিরে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়।
নাকাশিপাড়া পঞ্চায়েত সমিতিতেও সভাপতি নির্বাচন ঘিরে একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল। বিজেপির প্রতীকে জয়ী সদস্য থাকা সত্ত্বেও একজন নির্দল সদস্যকে সভাপতি করা হয়। যদিও বিজেপির দাবি, সংশ্লিষ্ট সদস্যকে পরিকল্পিতভাবেই নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিল এবং তিনি দীর্ঘদিনের বিজেপি পরিবারের সদস্য। কিন্তু দলীয় প্রতীকে জয়ী সদস্যকে বাদ দিয়ে নির্দলকে সভাপতি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের অন্দরেই প্রশ্ন উঠেছে।