অলকাভ নিয়োগী, বিধাননগর: কু-ঝিক ঝিক... । দু-পাশে হোগলা বন। তারই পাশে হাওয়া দুলছে কাশফুল। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে শিয়ালের হুক্কা-হুয়া ডাকও। মাঝখান দিয়ে ছুটছে মার্টিন রেল! বাগুইআটি স্টেশন আসতেই বেলগাছিয়া থেকে ওঠা কলকাতার দর্শনার্থীরা নামছেন হুড়মুড়িয়ে। তারপর সোজা পুজোমণ্ডপে। ঠাকুর দেখার অপার আনন্দ। এই গল্পের বয়স প্রায় নয় দশক। তখনো স্বাধীন হয়নি দেশ। ব্রিটিশ সরকারের শাসন। মার্টিন রেল আর নেই! মুছে গিয়ে স্টেশনের চিহ্নটুকুও। স্বাধীন হয়েছে দেশ। বাগুইআটির দেশবন্ধুনগরের ব্রিটিশ আমলের পুজো এবার নব্বইয়ে। সময় বদলালেও সেই প্রাচীন ঐতিহ্য, আবেগ আজও অটুট।
এলাকার বাসিন্দাদের কথায়, প্রায় ২০০ বছর আগের কাহিনি। হাওড়া-বাগবাজার হয়ে দুগ্ধ ব্যবসায়ী বাগুইরা বসবাস শুরু করেন। তাঁদের পদবি থেকেই বাগুইআটি নামের উৎপত্তি। বাগুইদের দান করা জমিতেই গড়ে ওঠে মার্টিন রেলের বাগুইআটি স্টেশন। যে অঞ্চল এখন রেলপুকুরপাড়া নামে পরিচিত। ১৯৩৭ সালে বাগুইআটি বাজার সংলগ্ন এলাকায় শুরু হয় এই সর্বজনীন পুজো। চারিদিকে ব্যাপক নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছর ১৯৩৮ সালে ভূপতিমোহন সেনের দান করা জমিতে মায়ের মণ্ডপ হয়। সেই থেকে ওই জায়গায় পুজো হয়ে আসছে। যা দেশবন্ধুনগরের দেশবন্ধু স্মৃতি মন্দির নামে পরিচিত। তবে, পুজোর পর ওই জায়গাটি পড়ে থাকত। তাই ১৯৫৪ সালে সেখানে তৈরি হয় দেশবন্ধু পাঠশালা।
১৯৯৩ সাল থেকে পার্শ্ববর্তী ক্লাব সুভাষ সংঘ পুজো পরিচালনার দায়িত্ব পায়। সেই থেকে এই ক্লাবের পরিচালনাতেই পুজো হয়ে আসছেন। তখনকার তরুণ কর্মকর্তারা আজ প্রবীণ। সভাপতি প্রদ্যুৎ ঘোষ ও সম্পাদক অমরনাথ গুহ বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই সাবেকিয়ানার পুজো হয়ে আসছে। একচালার প্রতিমা। সেই আদল বদলায়নি আজও। পুরানো ঐতিহ্য নেমেই আমরা পুজো করছি। তরুণ বয়স থেকে পুজোর সঙ্গে যুক্ত সমীর সাহা ও তাপস ভৌমিক। তাঁরা অবশ্য এখন প্রবীণ। মণ্ডপের সামনে পুরানো গল্প বলতে বলতে তাঁরা জানালেন, পুজো শুরুর সময় মার্টিন রেলে চড়ে বহু দর্শনার্থী ঠাকুর দেখতে আসতেন। বেলগাছিয়া থেকে মার্টিন রেল ছাড়ত। এখন সেই হোগলা বন নেই, শিয়ালের ডাক নেই, মার্টিন রেলও নেই। কিন্তু, আমাদের মা একই আড়ম্বরে পূজিত হয়ে আসছেন। আমাদের কোনোদিনই থিম নেই। সাবেকিয়ানাই আমাদের ঐতিহ্য। বাগুইআটির ইতিহাসও।



