নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন নিখাদ সোনা দিয়ে গড়া। রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে বীরভূমের সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে প্রতিবারের মতোই এবারও দুবরাজপুরের হেতমপুর রাজবাড়ির সেই ঐতিহাসিক পিতলের রথ। কালের নিয়মে রাজকীয় জমিদারি প্রথার অবসান ঘটেছে বহু বছর আগে, তবে ইংল্যান্ডের স্টুয়ার্ট কোম্পানির তৈরি পাঁচটি চূড়াবিশিষ্ট এই সুদৃশ্য রথের টান আজও একই রকম আকর্ষণ করে চলেছে আপামর জেলাবাসীকে। রাজ আমলের সেই চোখধাঁধানো ঘোড়সওয়ার বা পাইক বাহিনীর জৌলুস কমলেও ঐতিহ্যবাহী এই রথ ঘিরে ভক্তদের ভিড় ও উদ্দীপনা এবারও তুঙ্গে।
রাজ পরিবারের প্রাচীন ইতিহাস অনুযায়ী, ১২৫০বঙ্গাব্দের আশপাশে হেতমপুরের তৎকালীন রাজা রামরঞ্জন চক্রবর্তী বিশেষ অর্ডার দিয়ে ইংল্যান্ডের কোম্পানিকে দিয়ে এই বিশালাকার রথটি বানিয়েছিলেন। মূলত রাজপরিবারের নিজস্ব গৌরাঙ্গ মন্দিরের শ্রীগৌরাঙ্গ ও নিত্যানন্দের বিগ্রহের জন্যই এই রথটি উৎসর্গ করা হয়েছিল। আদি প্রথা মেনে রথের দিন এই দুই বিগ্রহই মূল বেদিতে চাপানো হত। রাজা রামরঞ্জনের তৈরি ‘ব্রজবালা ট্রাস্ট’-এর সম্পত্তি থেকে আসা লভ্যাংশ দিয়েই চলত রাজকীয় রথযাত্রার বিপুল খরচ। শোনা যায়, শোভাযাত্রার একেবারে সামনে থাকত বিশাল আকৃতির সুসজ্জিত সাদা ঘোড়া ও তার সওয়ারি। তার পিছনে থাকত আরও চারটি ঘোড়া এবং রুপোর দণ্ডে রাজকীয় পতাকা বাঁধা পাইক বাহিনী। রাজাদের গৌরাঙ্গ মন্দির থেকে বিগ্রহ নিয়ে রথ যখন বের হত তখন রাজবাড়ি ছুঁয়ে তা যেত গ্রামের অন্য প্রান্তের রাধাবল্লভ মন্দিরে।
তবে সময়ের সঙ্গে এই রথযাত্রার পরিচালনায় বড় বদল আসে। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি এবং চরম আর্থিক দৈন্যদশার জেরে ২০০৭সালে তৎকালীন রাজা মাধবীরঞ্জন চক্রবর্তী বাধ্য হয়েই রথ ও মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনার ভার লিখিত চুক্তির মাধ্যমে গৌড়ীয় মঠের হাতে অর্পণ করেন। মঠ কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার পর অবশ্য রাজবাড়ির আদি ধর্মীয় বিশ্বাসে কিছুটা পরিবর্তন আনে। তারা সনাতন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর বিগ্রহ মন্দিরে রেখেই রথের উপর জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি চাপানো শুরু করে। বর্তমানে শ্রীগৌরাঙ্গ মঠ থেকে রথটি সাড়ম্বরে বের হয়ে প্রধান রাস্তা ধরে রাধাবল্লভ মন্দির পর্যন্ত যায়। সন্ধ্যার অন্ধকার নামার আগেই পুনরায় মঠে ফিরিয়ে আনা হয়। ঐতিহ্যের এই আবহেই গত কয়েক বছর ধরে রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে রাজপরিবার ও মঠের অন্দরে তীব্র বিরোধ ও টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। রাজবাড়ির বর্তমান সদস্যদের মূল ক্ষোভ ও অভিযোগ হল, মঠ কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে রথযাত্রার দিন ঐতিহ্যবাহী রথটিকে আর রাজবাড়ির মূল ভবন অর্থাৎ ‘রঞ্জন প্যালেস’ প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয় না। এনিয়ে রাজপরিবারের আবেগের সঙ্গে মঠের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। রাজপরিবার এবার নিজেরা রথ বের করার দাবি তোলে। এনিয়ে এলাকায় ব্যাপক শোরগোল পড়লেও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় ও প্রশাসনিক মধ্যস্থতায় সেই বিবাদ সাময়িকভাবে মেটানো গিয়েছে। রাজ পরিবারের স্বাধিকারের দাবি খারিজ করে এবারও রথ বের করার চূড়ান্ত দায়িত্ব থাকছে হেতমপুর গৌরাঙ্গ মঠের হাতেই। মঠের সর্বেসর্বা ত্রিদণ্ডী মহারাজ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘২০০৭ সালে রাজা মাধবীরঞ্জন নিঃশর্তে চুক্তির মাধ্যমে আমাদের হাতে রথ ও মন্দির তুলে দিয়েছিলেন। রাজ পরিবারের সদস্যরা সমস্যা করার চেষ্টা করলেও আইনিভাবে রথ আমরাই বের করছি। ভবিষ্যতেও আমরাই বের করব।’