অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: গোবরেও পদ্মফুল ফোটে! প্রমাণ করে ছাড়লেন পূর্বস্থলীর ছেলে মহম্মদ রেহান শেখ। তাঁর বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্নে বদনাম ঘোচাতে চায় দুষ্কৃতী তৈরির ‘আঁতুড়ঘর’ বলে পরিচিত খড়দত্তপাড়া গ্রাম।
অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: গোবরেও পদ্মফুল ফোটে! প্রমাণ করে ছাড়লেন পূর্বস্থলীর ছেলে মহম্মদ রেহান শেখ। তাঁর বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্নে বদনাম ঘোচাতে চায় দুষ্কৃতী তৈরির ‘আঁতুড়ঘর’ বলে পরিচিত খড়দত্তপাড়া গ্রাম।
একটা সময় পুলিশ সুপারদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল খড়দত্তপাড়া। খাগড়াগড় বিস্ফোরণকাণ্ডেও নাম জড়িয়েছিল এই গ্রামের। হানা দিয়েছিলেন এনআইএ অফিসাররাও। কথিত, যুগ যুগ ধরেই নাকি গ্রামটি হয়ে উঠেছিল দুষ্কৃতী তৈরির আস্ত একটা কারখান। সেই গ্রামেরই ছেলে রেহান এবার আইআইটি খড়গপুরে পড়ার সুযোগ অর্জন করলেন। তিনি সেখানে মেটালার্জিক্যাল আ্যন্ড মেটিরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশুনা করছেন। রেহানের লক্ষ্য দেশের হয়ে কাজ করা।
পূর্বস্থলী-২ ব্লকের পিলা অঞ্চলের খড়দত্তপাড়া, হাঁপানিয়া, পাঠানপাড়া এসব গ্রামগুলিতে একটা সময় দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব চলত। লোকে বলত, ওইসব গ্রামগুলি দুষ্কৃতী তৈরির আঁতুড়ঘর ছিল। খুন, জখম সহ নানা অপরামূলক কাজে জড়িয়ে ছিল ওইসব গ্রাম গুলির বহু যুবক। মোরগ নয়, বোমের শব্দে ওইসব গ্রামের বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙত। বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠত। গ্রামে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাদের আনাগোনা লেগে থাকত। শুধু তাই নয়, খাগড়াগড় কাণ্ডেও এনআইএ এসে ওই গ্রাম থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করেছিল৷। সেই খড়দত্তপাড়া গ্রামের ছেলে মহম্মদ রেহান শেখ বিজ্ঞানী হওয়ার লক্ষ্যে আইআইটি খড়গপুরে পড়াশুনা করছেন।
পাটুলি শ্রীরামপুর ভারতীভবন উচ্চবিদ্যালয়ের আংশিক সময়ের শিক্ষক মহম্মদ সুরজউদ্দিন শেখের একমাত্র ছেলে মহম্মদ রেহান শেখ বরাবরই মেধাবী পড়ুয়া। রেহানরা কাটোয়া শহরের স্টেডিয়ামপাড়াতে ভাড়া থাকেন। তাই তাঁর পড়াশুনা সব কাটোয়া শহরেই। কাশীরাম দাস বিদ্যায়তন থেকে মাধ্যমিকে তিনি ৯৬.৫৭ শতাংশ ও উচ্চ মাধ্যমিকে ৯৭ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তারপর রেহান আইআইএসইআর বেঙ্গালুরুতে ২০২৫ সালে ৫৭৮ র্যাঙ্ক করেছিলেন। এরপর তিনি ডব্লুবিজেএইতে ৪৯৬ র্যাঙ্ক অর্জন করেছিলেন। জেই মেইন পরীক্ষাতে তিনি ৯৯ শতাংশ নম্বর পেয়েছিলেন। কিন্তু রেহান ডাক্তারি পড়ার সুযোগ ছেড়ে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য জেই অ্যাডভান্স পরীক্ষা দেন। সেখানে রেহান ৮০৯৭ র্যাঙ্ক পেয়ে আইআইটি খড়গপুরে পড়ার সুযোগ পেলেন। গত ২২ জুলাই খড়গপুরে তিনি ভর্তি হয়ে যান।
রেহান বলেন, বাবা, মা ও শিক্ষকরা আমাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে রাস্তা দেখিয়েছেন। আমার খড়দত্তপাড়া গ্রামেরই এখন অনেক ছেলেই মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকে৷ আমিও মোবাইল দেখি। তবে আমি পড়াশুনার জন্য বিভিন্ন পডকাস্টের জিনিস দেখি। আর গ্রামের বদনাম ঘুচবে তখনই যখন নৈতিক শিক্ষা সবার মধ্যে থাকবে।
রেহানের বাবার স্বল্প আয়। খুব কষ্ট করে জমি বিক্রি করে ছেলেকে পড়িয়েছেন তিনি। মহম্মদ সুরজউদ্দিন শেখ বলেন, ছেলেকে এতদুর নিয়ে যেতে পেরেছি এটা যেমন আমার কাছে আনন্দদায়ক। তেমনি আর্থিকভাবেও আমি দূর্বল। তবুও আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি শিক্ষকদের অনুপ্রেরণাতে।
পড়াশুনা ছাড়াও ক্রিকেট খেলার ঝোঁক রেহানের ছোটো থেকেই। তবে তাঁর অদম্য জেদ ও পরিশ্রমের জেরেই তাঁকে আজ দেশের সেরা জায়গায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন রেহান খড়দত্তপাড়া গ্রামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত করতে পেরেছে।
এক সময়ে পূর্ব বর্ধমান জেলায় পুলিশ সুপারের পদ সামলানো তথা প্রাক্তন মন্ত্রী হুমায়ূন কবীর বলেন, আমাদের সে সময় খড়দত্তপাড়া গ্রাম রাতের ঘুম কেড়ে নিত। এনকাউন্টার করতে হত গ্রামে। এখন সেখান থেকে আইআইটি খড়গপুরে পড়তে যাওয়া অবাক করা বিষয়। ভালো লাগছে গ্রাম বদলেছে। সমাজ গঠনে এসব মেধাবীরাই তো এগিয়ে আসেন। আমি ওই পড়ুয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করব। তাঁকে আরও উৎসাহিত করব৷
রেহানের বাবা বলছিলেন, আমার ছেলে দেশের হয়ে কাজ করতে চায়। আমরা সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছি। তবে আর্থিক বাধা কতটা কাটিয়ে উঠতে পারব জানি না।