সংবাদদাতা, রামপুরহাট: ব্যাঙ্কের লকারকে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করেন। সেকারণে নিজেদের মূল্যবান সম্পদ গচ্ছিত রাখেন। কিন্তু সেই লকারেই আসল সোনা বদলে দিয়ে নকল সোনা রাখার অভিযোগ উঠল রামপুরহাটের একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখায়। অভিযোগ, এই চক্রের মূল পান্ডা খোদ ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। শুক্রবার রাতে অভিযুক্ত ব্রাঞ্চ ম্যানেজার অনল সাহাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার জেরে জেলায় ব্যাপক শোরগোল পড়েছে।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার সূত্রপাত ২০২২-’২৩ অর্থবর্ষে। সেইসময় বেশকিছু গ্রাহক নিজেদের সোনার গয়না জমা রেখে ওই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। তখন ওই শাখার ব্যাঞ্চ ম্যানেজার ছিলেন অনল সাহা। তাঁর বাড়ি মালদহের ইংলিশবাজারের সদরঘাটে। নিয়ম অনুযায়ী গয়নাগুলি ব্যাংকের নির্দিষ্ট লকারে সুরক্ষিত রাখা হয়। সম্প্রতি ঋণ পরিশোধের পর গ্রাহকরা যখন নিজেদের জমা গয়না ছাড়াতে যান তখন তাঁরা দেখেন, আসল গয়নার জায়গায় তাঁদের দেওয়া হচ্ছে নকল সোনা। হতভম্ব গ্রাহকরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙ্কের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ জানান। এরপরই নড়েচড়ে বসে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ইন্টারনাল অডিটে দেখা যায়, লকার থেকে ৯জন গ্রাহকের আসল সোনার গয়না গায়েব করে সেখানে সুকৌশলে নকল সোনা রেখে দেওয়া হয়েছে। ব্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে আসে, লকারের এই সুরক্ষাবলয় ভাঙার পিছনে খোদ ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এবং ব্যাংকের গয়নার মূল্য নির্ধারণকারী আধিকারিক সরাসরি যুক্ত। তাঁরা দু’জনে মিলে ষড়যন্ত্র করে লকারের আসল সোনা বাইরে বিক্রি করে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
লকার জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ মেলায় ২০২৪সালের ২৬জুলাই ব্যাংকের এরিয়া ম্যানেজার রাজেশ ঘোষ রামপুরহাট থানায় অনলবাবুর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ব্যাংক তাঁকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করে। তবে মামলার পর থেকেই গা ঢাকা দিয়েছিলেন অনল। অবশেষে দীর্ঘ দু’বছর পর পুলিশ মালদহ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানিয়েছে, এই মামলার অন্য অভিযুক্ত তথা গয়নার মূল্য নির্ধারণকারী আধিকারিক ঘটনার কিছুদিন পরেই মারা যান।
শনিবার অভিযুক্ত অনলবাবুকে রামপুরহাট মহকুমা আদালতে তোলা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, বিশ্বাসভঙ্গ এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু করেছে পুলিশ। সরকারি আইনজীবী সৈকত হাটি বলেন, মামলার গুরুত্ব এবং সোনা উদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার কথা বিচার করে বিচারক অভিযুক্ত ব্যাংক ম্যানেজারের সাতদিন পুলিশি হেপাজত মঞ্জুর করেছেন। যদিও অভিযুক্তপক্ষের আইনজীবী জাহির রাইহান বলেন, সন্দেহের বশে আমার মক্কেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ওই বেসরকারি ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। ধৃত ম্যানেজারকে জেরা করে পুলিশ এখন জানার চেষ্টা করছে, লকার থেকে সরিয়ে নেওয়া আসল সোনা কোথায় রয়েছে বা কার কাছে বিক্রি করা হয়েছে। চক্রের সঙ্গে ব্যাংকের অন্য কোনো কর্মী বা বাইরের কোনো সোনা ব্যবসায়ী যুক্ত আছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনা চাউর হতেই ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।