


প্রদীপ আচার্য: দাদুকে বাবান একটা সারপ্রাইজ দেবে। দাদুর মন ভালো করার সেটাই হবে সেরা দাওয়াই। ক’দিন থেকেই তার দাদু সদানন্দবাবু মুখ ভার করে বসে আছেন। বারাসত থেকে নিখিলেশদাদুর ফোন পাওয়ার পর থেকেই এমন হয়েছে। সব সময় গুম মেরে বসে থাকেন দাদু। যেদিন যাওয়ার কথা, তার আগের দিন রাতে নিখিলেশদাদু ফোনে দাদুকে বলেছে, ‘কাল আসিস না রে। ক’দিন বাদে আয় বরং। আমি একটু পারিবারিক উটকো ঝামেলায় ব্যস্ত থাকব কাল থেকে। আনঅ্যাভয়ডেবল সারকমসট্যান্সেস। বুঝলি তো?’
‘অ। ঠিক আছে।’ বলে দাদু ফোন কেটে গা ছেড়ে দিয়ে সোফায় বসে পড়েছেন। বাবানই দাদুকে ফোনটা এনে দিয়েছিল। দাদু পাশের ঘরে বাবার কাছে ছিলেন। বাবান গিয়ে বলেছে, ‘দাদু ধর, তোমার ফোন।’ বাবানের সামনেই কথা হয়েছে। সে দাদুর ফোনালাপ শুনে আন্দাজ করেছিল, সামথিং রং। হলও তাই। মানে পরদিন সকালে বাবান আর তার দাদুর বারাসাতে যাওয়া ভেস্তে গেল। মানে যাওয়া হচ্ছে না। দু-চারদিন আগে জানালেও অতটা ভেঙে পড়ার কারণ ছিল না। কিন্তু যখন সব গোছগাছ রেডি, খুব ভোরে উঠে বেরিয়ে পড়ার কথা, ঠিক সেই মুখে এসে এটা একটা ধাক্কাই বলা যায়। যাওয়া বাতিল হয়েছে শুনে ঠাকুমা মাধুরীদেবী আবার দাদুর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘বেশ হয়েছে। এতে কোনও মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। লোকে এটা খোঁজে, সেটা খোঁজে, টাকা-পয়সা খোঁজে, পুরনো দলিল দস্তাবেজ খোঁজে, পুরনো আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব খোঁজে। আর উনি যাচ্ছেন কি না শৈশব খুঁজতে! বাপের জম্মে কেউ শৈশব খুঁজতে যায় বলে শুনিনি।’ ঠাকুমার কথার খোঁচায় সাঁই করে মাথায় রক্ত চড়ে যায় সদানন্দবাবুর। তবু রাগ সামলে নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘যা বোঝ না, তা নিয়ে কথা বলতে এসো না। শৈশব খোঁজার সঙ্গে পুরনো বন্ধুদের খোঁজাও জড়িয়ে থাকে। আরও অনেক কিছু খোঁজা জড়িয়ে থাকে। এটা একটা টোটাল প্যাকেজ বুঝলে হে? আমাদের শৈশবে অনেক থ্রিল ছিল। সাসপেন্স ছিল। কৌতুক ছিল, হাসি ছিল,
মজা ছিল।’
খুব ভোরে বাবানকে নিয়ে সেই মজার শৈশবেই যাওয়ার কথা ছিল। হল না যাওয়া। গাড়ি বলে রাখা ছিল। গাড়িকে না করে দিতে হল।
যাওয়ার তোড়জোড় চলেছিল বেশ ক’দিন ধরেই। বাবান বলেছিল, দাদু, আমাকে কিন্তু কিছু কার্টেজ পেপার আর টু-বি, ফোর-বি স্কেচ পেন্সিল এনে দিও। ওখানে গিয়ে কিছু স্কেচ করব আমি। যা মনে হবে আঁকব। দাদু সেই পেপার আর স্কেচ পেন্সিলও এনে দিয়েছিলেন। বাবান আঁকা শেখে। আঁকার দিকে ভীষণ ঝোঁক ওর। এইটুকু ছেলের আঁকা দেখলে চমকে উঠতে হয়। হিউম্যান ফিগারের টোনগুলো দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। সদানন্দবাবু বোঝেন বাবানের মধ্যে একটা শিল্পীমন বাসা বেঁধেছে। তা সেই শিল্পীমন তো একটু খোলা হাওয়া বাতাস খুঁজবেই। সেটা বুঝেই বাবানকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সদানন্দবাবু।
বাবানের সঙ্গে ওর দাদুর যত রাজ্যের গল্প। বাবান ওর দাদুর ফ্যান। সদানন্দবাবুও যেন বৃদ্ধ বয়সে এসে একজন নতুন বন্ধু পেয়েছেন। দাদুর ব্যাপারে বাবান খুবই কেয়ারিং। চোখ পাকিয়ে শাসন করবে। সদানন্দবাবুও তখন যেন ছোট্ট শিশুটি হয়ে যান। বাবানের সঙ্গে শৈশবের ব্যাপারস্যাপারগুলো শেয়ার করার আনন্দই আলাদা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটা ফোনই সব বানচাল করে দিল।
বারাসতে সদানন্দবাবুরা যে পাড়ায় ভাড়া থাকতেন, সেই পাড়া আর তার আশপাশটা ঘুরে দেখার সাধ জেগেছে। অনেকদিন ধরেই দাদু বলছেন, ‘শৈশব আমাকে খুব টানছে, বুঝলি? বারাসতের শিবানন্দ পল্লিতে আমার শৈশব লুকিয়ে আছে। আমাকে গিয়ে সেই শৈশবকে খুঁজে বের করতে হবে।’ দাদুর কথায় বাবান খুবই মজা পায়। সে বলে, ‘শৈশব আবার কারও কোথাও লুকিয়ে বসে থাকে নাকি যে, তুমি গিয়ে তাকে খুঁজে বের করবে।’ দাদু বলে, ‘থাকে দাদুভাই, থাকে। আমাদের সেই পুরনো পাড়ার গলিতে, আমাদের বাড়ির উঠোনে জামরুল গাছটার মগডালে কোথাও না কোথাও সে লুকিয়ে বসে আছে। আমি সেখানে গিয়ে তাকে খুঁজে বের করবই।’ বাবান বলে, ‘সে নয় হল দাদু, কিন্তু তুমি জামরুল গাছের মগডালে তাকে খুঁজবে কেন?’
‘আরে ওই জামরুল গাছটাই তে ছিল আমার স্বর্গরাজ্য। মা লাঠি নিয়ে তেড়ে এলে ছুটে গিয়ে লাফিয়ে গাছে উঠে পড়তাম। মায়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা হতো। মা চিৎকার করে বলত, আজ একবার বাড়ি আয়। আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন। আমি তখন ফৌজি জওয়ানদের মতো গাছের পাতার আড়ালে কেমোফ্লেজ করে বসে থাকতাম।’
বাবান বলল, ‘তোমার মা তোমায় লাঠি নিয়ে তাড়া করত কেন?’ সদানন্দবাবু হাসলেন। বললেন, ‘খুব দুষ্টু ছিলাম তো আমি। কিন্তু সেই দুষ্টুমিতে কারও কোনও ক্ষতি হতো না। বরং পাড়ার লোকের অনেক উপকারই করতাম। কেউ বলল তো একছুট্টে মুদি দোকান থেকে কাউকে নুন, চিনি, তেল, সাবান এনে দিতাম। কেউ বলত, খাম বা পোস্টকার্ড ডাকবাক্সে ফেলে আয়। ফেলে আসতাম। কারও টালির চালে উঠে লাউ, চালকুমড়ো এসব পেড়ে দিতাম। আবার কারও ঘরে সাপ ঢুকেছে, বাড়িতে বড়রা কেউ নেই। মাসিমা, কাকিমাদের বল ভরসা তখন আমি।’
‘সাপ! তোমার ভয় করত না?’
‘না রে, আমার খুব সাহস ছিল। বাঁশের কঞ্চি এনে খুঁচিয়ে ঘরের কোনাঘুপচি থেকে সাপকে টেনে বের করে আনতাম। বুঝলি? এই সব থ্রিল ছিল আমার শৈশবে।’
‘দাদু, আর কোথায় কোথায় খুঁজবে তোমার শৈশবকে?’
‘শেঠপুকুর মাঠে খুঁজব। ওখানে দেখব, জলকাদা মেখে সেই গোলকিপার এখনও দাঁড়িয়ে আছে নাকি!’
‘তুমি গোলকিপার ছিলে?’
‘হ্যাঁ, চার দশে ফেমাস গোলকিপার ছিলাম।’ কথা শেষ করে সদানন্দবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আর কী হবে? যাওয়া তো হল না। পুজো এসে গেছে। এখন গেলে খুব মজা করে ঘুরতে পারতাম বুঝলি? কলকাতা থেকে একটু দূরেই তো। গেলে আকাশে মেঘ ও রোদের লুকোচুরি খেলা দেখতে পেতাম। খোলা আকাশ। শরতের রোদ। আহা! মধুমুরলীর দিঘির পাড়ে সাদা বকের ঝাঁক। যেন ওদের মেলা বসে গেছে। আমাদের ওখানে শিবানন্দ আশ্রমে নগেন পাল এসে ঠাকুর গড়ত। আমরা সব ভিড় করে দেখতাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। সেই কাঠামো তৈরি, খড়ের গায়ে মাটি লেপা থেকে শুরু করে দেবীর চক্ষুদান পর্যন্ত সব দেখতাম। কী উত্তেজনা তখন। পুজোর আর ক’দিন বাকি— শুধু দিন গুনতাম। সেই আশ্রমে একবার ঢুঁ মারার ইচ্ছে ছিল। দেখে আসতাম প্রতিমা গড়া কদ্দূর এগল। বারাসতের বনমালীপুরের মৈত্রী সংঘের দুর্গাপুজোয় আরতি প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিলাম। তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। নবমীর দিন পাড়ার গৌরীশঙ্করদা মাকে বলে সাইকেল চাপিয়ে আমায় নিয়ে গেছিল। আমি ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছিলাম। আরতি করার পরে আমি ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। গৌরীদা ডেকে তুলল। বলল, ওঠ। তোর নাম অ্যানাউন্স করছে। ফার্স্ট হয়েছিস— যা প্রাইজ নিয়ে আয়। আমার মনে আছে, বিচারক আমার হাতে নজরুলের অগ্নিবীণা দিয়ে আমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। সেই বনমালীপুরেও একবার ঢুঁ মারব ভেবেছিলাম। তা আর হল না।’
দাদুর মুখে সব শুনে বাবানের মনও বেশ নেচে উঠেছিল। তার মনেও কল্পনার রঙে অনেক ছবি আঁকা হচ্ছিল। তার মনটাও খুব খারাপ হয়ে গিয়েছে। বাবান কিন্তু মনখারাপ করে বসে থাকল না। যাওয়া ক্যান্সেল হওয়াতে তার দাদু খুবই মুষড়ে পড়েছেন। তাই দাদুর মনটা কী করলে ভালো করে দেওয়া যায়, সেই চিন্তাতেই সে মগ্ন হয়ে থাকল দু’ তিনদিন ধরে। পড়াতেও ঠিকঠাক মন বসছে না। কোচিং ক্লাসের ভবতোষ স্যার বলেছেন, ‘কী ব্যাপার রে তোর? কী ভাবছিস বসে বসে?’ বাবান মনে মনে বলেছে, সে খুব গোপন কথা। কাউকে বলা যাবে না। ভাবতে ভাবতে শেষ ইস্তক একটা প্ল্যান এল বাবানের মগজে। বাবান ভেবে নিল, দাদুর মন ভালো করে দিতে এর চেয়ে ভালো দাওয়াই আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু প্ল্যানটা কাউকে জানতে দেওয়া যাবে না। দাদুকে সে সারপ্রাইজ দেবে।
ঠিক তার হপ্তা খানেক বাদে বাবান দাদুকে ডেকে বলল, ‘দাদু, তুমি চোখ বুজে বসে থাক। চোখ খুলবে না।’ সদানন্দবাবু বললেন, ‘কী, ব্যাপার কী?’
‘না তুমি এখানে বসে চোখ বোজ আগে।’ সদানন্দবাবু সোফায় বসে চোখ বুজলেন। বাবান তখন তার দাদুর কোলে নিজের শিল্পকর্ম রেখে দিয়ে বলল, ‘এবার চোখ খোল।’ চোখ খুলে সদানন্দবাবু তো অবাক। পেন্সিল স্কেচে আঁকা আশ্চর্য সব ছবি। জামরুল গাছের ডালে পাতার আড়ালে চুপটি করে লুকিয়ে বসে আছে ছোট্ট একটা ছেলে আর গাছের নীচে তার মা লাঠি উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জলকাদা মেখে ফুটবল মাঠের গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে আছে বালক গোলকিপার। দুর্গামণ্ডপে মৃৎশিল্পী প্রতিমা গড়ছেন। আর একদল ছেলে ভিড় করে দাঁড়িয়ে দেখছে। দুর্গামণ্ডপে একটা ছোট্ট ছেলে ধুনুচি হাতে আরতি নাচছে। একটা একটা করে সব ছবি উল্টে দেখে আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন সদানন্দবাবু। বললেন, ‘বাঃ বাঃ! চমৎকার এঁকেছিস তো! এ তো একেবারে জীবন্ত সব ছবি। এই তো, এই তো আমার শৈশব। এই তো আমি খুঁজে পেয়েছি। আমি
খুঁজে পেয়েছি।’