জীবানন্দ বসু: বরুণ সেনগুপ্ত। বাংলা ও বাঙালির মননে এক অবিস্মরণীয় নাম নিঃসন্দেহে। কেবল একজন সফল সাংবাদিক নন, সম্পাদক ও সংবাদপত্র পরিচালনার পাশাপাশি বাঙালি উদ্যোগপতি হিসেবেও এই মানুষটির অবদান ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছে কোনও বিতর্ক ব্যতিরেকেই।
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। ইন্দিরা গান্ধী খুন হয়েছেন দিল্লিতে। গোটা দেশ অগ্নিগর্ভ। কলকাতাতেও তার রেশ পড়েছিল অনিবার্যভাবেই। গোটা শহরে কার্ফু। বিক্ষিপ্ত গোলমাল চলছে চারদিকে। কিন্তু ১ নভেম্বর থেকে বর্তমান কাগজে আমাদের কাজে যোগ দেওয়ার কথা। তাই ৩১ তারিখের মধ্যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার জোড়া গির্জার অফিস থেকে সংগ্রহ করার নিদান ছিল। কিন্তু কার্ফুর কারণে শহরে যানবাহন চলাচল বন্ধ। তবু সুযোগ হারানোর ভয়ে সল্টলেকের বাড়ি থেকে হেঁটে গিয়েই সেদিন সেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে এসেছিলাম। আমার মতো একজন আনকোরা ছোকরার জেদ আর সাহস দেখে সেদিন কিন্তু তারিফ করতে কসুর করেননি বরুণদা। শুধু তাই নয়, পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বাড়ি ফেরার পথে শহরের আরও কিছু জায়গা ঘুরে পরদিন তার বর্ণনা লিখে আনার নির্দেশও দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, সেই নির্দেশ আমায় সেদিন আরও উৎসাহ জুগিয়েছিল। পরদিন পাতা ৩০-এর একটা দীর্ঘ রচনা ওঁর সামনে হাজির করেছিলাম। কপির সাইজ দেখে উনি একদিকে যেমন হেসে ফেলেছিলেন, তেমনই আবার পিঠ চাপড়েও দিয়েছিলেন আমার নির্ভয় মানসিকতার কথা মনে করিয়ে।
খবর সংগ্রহ করার কৌশল বা লেখা তথা উপস্থাপন করার তরিকা—সব কিছুই যেন চক-ডাস্টার দিয়ে স্কুলের ছাত্রকে পড়ানোর মতো করিয়ে শিখিয়েছিলেন আমাদের।
১৬ বছর হয়ে গেল বরুণদা ইহলোক ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু আমাদের ছেড়ে যাননি। এখনও প্রতি মুহূর্তে সেই ‘গার্জেন’ বরুণদাকে অনুভব করি। অফিসে তাঁর ওয়ার্ক স্টেশন আজও একই রকম ভাবে সজ্জিত। সর্বোপরি, প্রতিকূল সময়ে তাঁর বলা কথা বা দেওয়া নানা ঘটনার উদাহরণ যেন এখনও ‘সঞ্জীবনী বটিকা’র কাজ করে। বঁটিতে ধার না থাকলে কীভাবে মুগুর মেরে ভার-এ মাছ কাটতে হয় সেই ফর্মুলা সাংবাদিক জীবনে আত্মস্থ করেছিলাম বরুণদার হাত ধরেই। আজকের দিনে তাই এমন অভিভাবককে অন্তর থেকে জানাই লাখো কুর্নিশ।