শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: একটা সময় সকাল হলেই বসিরহাটের গ্রামের ঘরে ঘরে শোনা যেত মাকুরের খটখট শব্দ। হাতচালিত তাঁতে তৈরি হত বসিরহাটের ঐতিহ্যবাহী ‘মুন্সির গামছা’। পিফা, ভাবলা, কেয়ামারি, মাটিয়া থেকে পানিতরের পশ্চিম কারিগরপাড়া বিস্তীর্ণ এলাকার শত শত পরিবার জড়িয়ে ছিল এই শিল্পে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছত এই গামছা। ১৫০ বছরের সেই গৌরবময় ঐতিহ্যই আজ পাওয়ারলুমের দাপট, সুতোর দাম এবং কম মজুরির চাপে অস্তিত্বের সংকটে। পানিতরে এখন আর আগের সেই দৃশ্য নেই। কোথাও ভেঙে পড়েছে কারখানার চাল। কোথাও ধুলো জমেছে তাঁতে। মরচে পড়া যন্ত্র আর পরিত্যক্ত ঘরগুলি যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে একটি শিল্পের পতনের। পেটের দায়ে একে একে পেশা বদলেছেন কারিগররা। কেউ ইটভাটায়, কেউ দিনমজুরির কাজে, কেউ টোটো চালাচ্ছেন। কেউ আবার কাজের সন্ধানে পাড়ি দিয়েছেন ভিনরাজ্যে। আর নতুন প্রজন্ম? তাদের কাছে এই পেশা এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নাম। তার মধ্যেও একা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন পানিতরের গামছা কারিগর আব্দুল মান্নান মোল্লা। তাঁর কথায়, আগে পুরো পানিতর গ্রামটাই হাতে গামছা তৈরির কাজে যুক্ত ছিল। বাপ-দাদার আমল থেকে আমরা এই কাজ করে আসছি। এখন সুতোর দাম প্রচুর বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে কমেছে আয়। তাই সবাই অন্য কাজের দিকে চলে গিয়েছে। অন্য কাজ করি, দিনমজুরিও করি। সময় পেলে বাড়িতে বসে গামছা বুনি। কতটা কঠিন এই লড়াই? আব্দুলের হিসাবেই তার উত্তর। সারাদিন খেটে তাঁর হাতে তৈরি হয় মাত্র চারটি গামছা। অথচ সেই শ্রমের তুলনায় আয় এতটাই কম যে শুধু এই কাজ করে সংসার চালানো সম্ভব নয়। তাঁত ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাওয়া নুর হোসেন মোল্লার গল্প আরও দীর্ঘ। তাঁর পরিবার প্রায় ৫০-৬০ বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নুর বলেন, এই গামছায় এখন আর লাভ নেই। স্থানীয় কাপড় ব্যবসায়ী রাজীব বিশ্বাস বলেন, মুন্সির গামছার কদর রয়েছে। চাহিদা মেটানোর মতো জোগান নেই।



