Bartaman Logo
১৬ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সবথেকে ছোটো সদস্য

চট্টগ্রামের পাহাড়ি রাস্তায় খাকি হাফপ্যান্ট পরা যে চোদ্দো বছরের কিশোরটি একদিন মাস্টারদা সূর্য সেনের হাতে হাত মিলিয়ে ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার লুট করতে নেমেছিল, ব্রিটিশ পুলিশের খাতায় সে ছিল এক চরম বিপজ্জনক অপরাধী।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সবথেকে ছোটো সদস্য
  • ১৬ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়: চট্টগ্রামের পাহাড়ি রাস্তায় খাকি হাফপ্যান্ট পরা যে চোদ্দো বছরের কিশোরটি একদিন মাস্টারদা সূর্য সেনের হাতে হাত মিলিয়ে ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার লুট করতে নেমেছিল, ব্রিটিশ পুলিশের খাতায় সে ছিল এক চরম বিপজ্জনক অপরাধী। সেই ছিল ওই দলের সবচেয়ে ছোটো সদস্য। বয়স কম থাকায় ফাঁসি দেওয়া গেল না বটে, কিন্তু সোজা পাঠিয়ে দেওয়া হল বঙ্গোপসাগরের বুকে পরাধীন ভারতের সবচেয়ে ভয়ংকর নরককুণ্ড আন্দামানের সেলুলার জেলে। এখানেই শুরু হয়েছিল  বাস্তব জীবনের আসল লড়াই।

Advertisement

তাঁর পুরো নাম সুবোধ রায়, কিন্তু বিপ্লবীদের দুনিয়ায় তিনি ছিলেন সবার প্রিয় ‘টেকার’ বা ‘ঝন্টু’। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিলের সেই ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণের পর থেকে সুবোধ রায়ের জীবন আর দশটা সাধারণ বাঙালির মতো ছিল না। সেলুলার জেলে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু হয়  অমানবিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার। কিশোর সুবোধের জুটল দাগী আসামির কর্কশ কয়েদি পোশাক। জেলে ব্রিটিশদের অকথ্য গালিগালাজ ও চাবুকের মার ছিল প্রতিদিনের রুটিন।
তবে বন্দি কারাগারের লোহার শিক আর অন্ধকূপের অন্ধকারও সেই কিশোরের মন পারেনি। সেলুলার জেলের চরম নিষ্ঠুর পরিবেশের মধ্যেও সুবোধ ও তাঁর সহবন্দি বিপ্লবীরা এক অন্য লড়াই শুরু করেছিলেন। জেলের ভেতরেই গোপনে তৈরি হয়েছিল রাজনৈতিক পড়াশোনা ও পাঠচক্রের এক অদৃশ্য ব্যাবস্থা। সেখানে মার্ক্সবাদ, বিশ্বের ইতিহাস, সমাজতন্ত্র এবং বিপ্লবের দর্শনের পাঠ নিতেন। জেলের ঠান্ডা পাথরের মেঝেতে বসে সুবোধ রায় বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল ব্রিটিশদের দেশ থেকে বিতারিত করে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জেলের কঠিন নিয়মের ফাঁক গলে সেই সুপ্ত বাসনাই তাঁকে তিলে তিলে এক লড়াকু মানুষে পরিণত করেছিল।
এভাবে কেটে গেল জীবনের একে একে ১৭টি দীর্ঘ বছর। কিশোর বয়সে যে ছেলেটি সেলুলার জেলে ঢুকেছিল, দীর্ঘ কারাবাসের পর সে যখন বাইরে এল, তখন তার চোখের চশমার আড়ালে পরিণত বয়সের প্রজ্ঞা। যৌবনের সবচেয়ে সুন্দর ও উজ্জ্বল দিনগুলো ব্রিটিশ জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে তিলে তিলে ক্ষয় হয়ে গেছে। শরীর ভেঙেছে, কিন্তু মনের জেদ এক ফোঁটাও কমেনি।
জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দেশ তখন স্বাধীনতার দোরগোড়ায়। চারদিকে আনন্দের জোয়ার। কিন্তু সুবোধ রায় দেখলেন, দেশের মানচিত্র বদলালেও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ব্রিটিশ বেনিয়ারা চলে গেলেও ক্ষমতা রয়ে গেছে দেশীয় জমিদার ও শেঠদের হাতে, যারা আগে ব্রিটিশদের হয়ে কাজ করত। তাই তিনি আর বসে রইলেন না। যে হাত এক সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বন্দুক ধরতে কাঁপেনি, সেই হাত এবার পুরোপুরি সঁপে দিল মেহনতি মানুষের অধিকারে। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে তিনি হয়ে উঠলেন একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী ও তাত্ত্বিক। রাজপথের মিটিং-মিছিল থেকে শুরু করে কৃষকদের অধিকার আদায়—আমৃত্যু তিনি সাধারণ মানুষের ভিড়েই নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন, কখনো ক্ষমতার মোহ তাঁকে ছুঁতে পারেনি।
চট্টগ্রাম থেকে আন্দামান এবং সেখান থেকে স্বাধীন ভারতের রাজপথ—সুবোধ রায় চিরকাল ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবেন এক অপ্রতিরোধ্য লড়াকু সেনানি হয়েই বেঁচে থাকবেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ