শ্যামল সেন, হলদিয়া: পুরী ও মাহেশের রথের মতো মহিষাদলের ঐতিহ্যবাহী কাঠের রথের সুনাম রয়েছে। রাজবাড়ির রথ হলেও মহিষাদলের রথ এখন সর্বজনীন। রথের সূচনাকাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কাঠের তৈরি ২০০ বছরের বেশি পুরনো রথ ভূ-ভারতে আর কোথাও সচল অবস্থায় নেই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অগ্নিকাণ্ড সহ নানা কারণে গত দেড়শো বছরে ওই রথ একাধিকবার সংস্কার হলেও কখনও আমূল বদল হয়নি। বার্মা শাল ও সেগুন কাঠে তৈরি ২০০ বছরের পুরনো মূল কাঠামোর সিংহভাগই অটুট রয়েছে। ছ’তলা বাড়ির সমান উঁচু প্রায় ১০০টন ভারী কাঠের রথ এত বছর ধরে সচল রয়েছে, তা দেশিয় প্রযুক্তির এক বিস্ময় হিসেবে চিহ্নিত। এজন্য স্থানীয় মানুষ থেকে ইতিহাসকার সকলেই মহিষাদলের রথকে ‘চলমান হেরিটেজ’ বলেন। ওই রথের কাঠের প্যানেলের কাজ লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। স্থানীয়দের আক্ষেপ, বহু আবেদনের পরও সরকারি হেরিটেজ তকমা জোটেনি মহিষাদলের রথের। ওই রথ কোন সময়ে তৈরি তা নিয়ে নানা মত রয়েছে। একটি মতে, রানি জানকীদেবীর শাসনকালে ১৭৭৬ সাল নাগাদ রথ তৈরির হয়। অন্য মতে, রানি জানকীদেবীর মৃত্যুর পর ১৮০০ সালে কিছুদিনের জন্য মতিলাল পাঁড়ে(উপাধ্যায়) মহিষাদলের রাজত্ব পান। সেই সময়েই তিনি ৩৪ চাকা বিশিষ্ট ১৭ চূড়া রথ তৈরি করেন।
জানা যায়, মহিষাদলের রথ তৈরি করতে সেইসময় ৬ হাজার সিক্কা খরচ হয়েছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে অনেক ধরনের মুদ্রা চালু ছিল। এসবের মধ্যে একটি মানসম্মত ও সুনির্দিষ্ট ওজনের ধাতব মুদ্রা ছিল, যা ‘সিক্কা টাকা’ নামে পরিচিতি ছিল। রথ তৈরির ওই খরচ কীভাবে জোগাড় হয়েছিল? মহিষাদলের আঞ্চলিক ইতিহাসকার অর্ণব রায় বলেন, রথ তৈরির কারণ এবং এর খরচ কীভাবে উঠেছিল তা নিয়ে চমকপ্রদ ইতিহাস রয়েছে। সেই ইতিহাস খুব কম মানুষই জানেন। নুন তৈরির শ্রমিক বা মলঙ্গীদের আবেদন এবং ব্রিটিশের দেওয়া নিমক মাসোহারা থেকে রথ তৈরির খরচ উঠেছিল। অর্থাৎ রথ তৈরির জন্য নুনের শ্রমিকদের অবদান রয়েছে। মেদিনীপুরে উপকূল এলাকায় তখন ব্যাপক নুন উৎপাদন হত। দু’ভাবে এই নুন তৈরি হত। একটি প্রাকৃতিক উপায়ে সূর্যের তাপে অন্য পদ্ধতিতে কাঠের জ্বালানিতে লবণ জল ফুটিয়ে নুন মিলত। এজন্য মহিষাদল, সুতাহাটা এলাকায় ম্যানগ্রোভের জঙ্গল থেকে কাঠ এনে জ্বালিয়ে নুন মারা হত পাড়ায়। মহিষাদল এলাকার গ্রামের নামের সঙ্গে একারণে ‘জালপাই’ শব্দটি যুক্ত অর্থাৎ জ্বালন পাই থেকে অপভ্রংশ হয়ে জালপাই। অর্ণববাবু বলেন, মহিষাদল হলদি ও হুগলি দুই নদীর মাঝখানের ভূখণ্ড। রানি জানকীর সময়ে এই এলাকায় নুনের গোলা বা আড়ঙ্গ ছিল। ১৭৬০সালে মহিষাদল এলাকায় ব্রিটিশরা এসে সল্ট এজেন্ট নিয়োগ করে। মলঙ্গীদের কাছ থেকে নুন কিনত তারা। নুন থেকে ওই সময় ব্যাপক লাভ হত। এরফলে স্থানীয়ভাবে নুনের উৎপাদন বাড়তে শুরু করে।
ইতিহাস থেকে জানা গিয়েছে, নুন তৈরির ভাল কারিগর বা মলঙ্গীরা অনেকে ওড়িশা থেকে আসত। ওড়িশায় বড় উৎসব হত রথের সময়ে। সেসময় মারাঠা রাজ রঘুজি ভোঁশসে বাংলায় আক্রমণ চালায়। বাংলার ইতিহাসে যা বর্গী হাঙ্গমা নামে পরিচিত। পরে মারাঠা সৈন্যরা বাংলায় তাড়া খেয়ে ওড়িশা দখল করে নেয়। ওড়িশার শাসনভার পাওয়ার পর পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে আসে। তখন তারা তীর্থযাত্রীদের উপর ‘রথ কর’ বসায়। বিপাকে পড়েন মানুষ। দু’-আড়াইশো বছর আগে বাংলার এই মেদিনীপুর উপকূল এলাকার সঙ্গে ওড়িশার মানুষের ভাল যোগাযোগ ছিল। তাছাড়া হুগলি নদীর তীরে ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশ গড়ে তোলা ও ব্যবসা বাণিজ্য করার ফলে সমৃদ্ধ ছিল। এদিকে মহিষাদলের রানি জানকীদেবীর তখন দারুণ প্রভাব। রথ কর চালু হওয়ায় ক্ষুব্ধ কর্মসূত্রে আসা মলঙ্গীরা তখন পুরীর রথের মতো মহিষাদলেও বড় রথ চালুর জন্য আবেদন করেন। বিশাল রথের খরচ জোগাড় হবে কীভাবে? সেসময় ব্রিটিশরা রানিকে এলাকায় জমি ব্যবহারের জন্য নিমক মাসোহারা দিত। লবণ শিল্পের প্রসারের ফলে বাড়তি আয় হয়েছিল মহিষাদল রাজ এস্টেটের। সেই আয় থেকে রাজারা তাঁদের কুলদেবতা মদনগোপাল জিউর নবরত্ন মন্দির ও কাঠের রথ তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। ওই কাঠের রথ তৈরি হয়েছিল রত্নমন্দিরের আদলে। ইতিহাস গবেষক অধ্যাপক হরিপদ মাইতি বলেন, এখানকার রথের বৈশিষ্ট্য হল, রথযাত্রায় প্রধান দেবতা হলেন কুলদেবতা মদনগোপাল জিউ। তাঁর সঙ্গী হন জগন্নাথদেব। কিন্তু বলরাম, সুভদ্রা থাকেন না রথে।