নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দুপুর থেকে রাত। হাতিবাগান নবীন পল্লির ‘হাসিখুশি’ পাড়া দেখতে ছোটো গলিটিতে থিকথিক করছে ভিড়ে। লোক আর ধরে না! নতুন জামা, নতুন শাড়ির সেন্টের গন্ধে বুঁদ প্যান্ডেল। ভ্যাপসা গরমেও উৎসাহে খামতি নেই। টপ টপ ঘাম ঝরছে কপাল বেয়ে। মেকআপ প্রায় ধুয়ে যায় যায়। রুমাল, শাড়ির আঁচলে ঘাম মুছে চলছে ঠাকুর দেখা। নবীন পল্লির মণ্ডপে পুরানো আমলের হাতপাখা রাখা। গলির মুখে সাবেক ঢঙের বারান্দা থিমের সঙ্গে চমৎকার মানানসই। সেখানে বসে কয়েকটি মেয়ে হাতপাখায় হাওয়া খাচ্ছে। ভিড় থেকে একজন বললেন, ‘দিদি আমাদেরও হাওয়া করে দিন না। নয়তো ক’টা পাখা দিন... হাওয়া খাই।’
রাত যত গড়িয়েছে, কালো মাথার ভিড়ে হাসফাঁস পরিস্থিতি শহরের। দেখে মনে হচ্ছে ষষ্ঠী নয়, শুক্রবারই যেন নেমে এসেছে অষ্টমী। উত্তর কলকাতার হাতিবাগান সর্বজনীন বা কাশী বোস লেনের ছবিও এক। ভিড়ের চাপে ভলান্টিয়ারদের চিৎকার—‘দাঁড়াবেন না। চলতে থাকুন। ছবি তুলতে তুলতে এগিয়ে চলুন।’ কখনো ঠেলাঠেলির চোটে তাঁদের সঙ্গে ঝগড়াও শুরু হয়ে যাচ্ছে দর্শনার্থীদের। হাতিবাগান, খান্না, ডালিমতলা, হরি ঘোষ স্ট্রিট কিংবা শ্যামবাজার, বাগবাজার দেখে কেউ বলবে না যে, এ আসলে ষষ্ঠীর ভিড়। উত্তরের মতোই হাল দক্ষিণ কলকাতার। আলিপুরের সুরুচি, চেতলা অগ্রণী, আলিপুর সর্বজনীন, ত্রিধারা, বালিগঞ্জ কালচারালের মণ্ডপে তিলধারণের জায়গা নেই।
পঞ্চমীতে ঠাকুর দেখার খানিকটা তাল কেটেছিল বৃষ্টি। ছাতা হাতে ঘেমেনেয়ে একসা হয়েও ঠাকুর দেখেছে সবাই। তবে রাত কাটতেই ষষ্ঠীর সকাল থেকে ঝলমলে আবহাওয়া। ফলে চুটিয়ে ঠাকুর দেখতে পথে জনতা। রাত গড়ালে মহানগরের পথের দখল নিয়ে নেয় পুজো-পাগল বাঙালি। এ ভিড়ের কোনো জাতপাত নেই, ধর্ম নেই। সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঠাকুর দেখেছে। বসিরহাটের বাসিন্দা মহম্মদ শিমুল আলিপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করেন। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন সুরুচি সংঘে। বললেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। ছোটো থেকে সেই বিশ্বাসেই বিশ্বাসী। ছ’বছরের সন্তানকে সেটাই শেখাচ্ছি। আমাদের বসিরহাটে ইছামতীতে ভারত-বাংলাদেশের দুর্গাপুজোর ভাসান হয়। টাকি গিয়ে সে আনন্দ উপভোগ করি। প্যান্ডেল হপিংয়েও বের হই নিয়ম করে।’ তবে পঞ্চমী বৃষ্টিতে ভিজিয়েছিল। ষষ্ঠী ভেজাল ঘামে। বেলা গড়াতেই একডালিয়া, ত্রিধারা, সিংহী পার্ক, বালিগঞ্জ কালচারাল, সমাজসেবীতে মানুষের ঢল। রাত বাড়তেই সেই ভিড়ের ছবি আরও ঠাসা। শহরের রেস্তরাঁগুলিরও দম ফেলার সময় নেই। বাইরে চেয়ার পেতে অপেক্ষা। কাতর চোখে তাকিয়ে থাকা... মেরা নম্বর কব আয়েগা?
ষষ্ঠী মানে তরুণ-তরুণীদের ম্যাডক্স স্কোয়ার মাস্ট। সেখানে দেখা হয় পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে। সেই ট্র্যাডিশন অনুযায়ী এদিন ম্যাডক্স স্কোয়ারে ভিড় জমিয়েছিল অনেকেই। কলকাতার আশপাশের জেলা থেকে প্রচুর দর্শনার্থী কলকাতায় এসেছিলেন ঠাকুর দেখতে। সকাল থেকেই স্টেশনগুলিতে ভিড়। ট্রেনে ভিড়। গড়িয়া থেকে কলকাতাগামী মেট্রোতেও ভিড়। তবে নিউ গড়িয়া মেট্রো বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়তে হয়েছে দক্ষিণ শহরতলির বহু মানুষকে। সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে জোর সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু তাতে ঠাকুর দেখা থামেনি। চুটিয়ে আনন্দ করার ইচ্ছেতে কারো খামতি দেখা যায়নি। ষষ্ঠীতেই দুর্গাপুজোর আনন্দ চেটেপুটে চেখেছে সবাই। হাতে আরও বেশ কয়েকটি দিন। আরও ঠাকুর দেখতে হবে, মণ্ডপে ঘুরতে হবে, আরও ভালোমন্দ খেতে হবে, আরও আনন্দ করতে হবে। পুজো সবে তো শুরু ব্রো...!



