


বাপ্পাদিত্য রায় চৌধুরী, কলকাতা; কাঠের পেল্লায় সিংহদুয়ার ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই প্রশস্ত ঠাকুর দালান। তিনদিকে চওড়া খিলানে ভর করে ঘিরে রয়েছে পুরোনো ঘরদোর। আর একদিকে গর্ভগৃহের বেদিতে ক্রমশ দেবীসাজে সেজে উঠছেন মাদুর্গা। এখানে তাঁর উপাসনা হয়ে আসছে বিগত ৫৭০ বছর ধরে। তবে কোন্নগরের ঘোষাল বাড়ির এবারের ৫৭১তম পুজোর গন্ধ একটু
আলাদা। কারণ, এবার নবমী নিশিতে যে তাঁর সামনে হাজির হবেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার! যে নাটমন্দিরের প্রতিটি কোণে লেগে আছে অর্ধ সহস্রাব্দ পেরিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য, সেখানে এবার জীবন্ত হবে স্বর্ণযুগের আরও এক আলোয় মোড়া ইতিহাস। ঘোষালদের ঐতিহাসিক পুজোয় এবার ইতিহাসেরই রমরমা।
একাদশ শতাব্দীতে বাংলার মহারাজ আদি সুরের আমন্ত্রণে বাংলায় আসেন কনৌজের বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ সুধানিধি। রাজা লক্ষণ সেন তাঁকে নবরত্নের এক রত্ন করে নিয়ে আসেন রাজসভায়। সুধানিধির বংশধরদের উপাধি দেওয়া হয় ঘোষাল। সেই ঘোষালদেরই একটা অংশ চলে আসে হুগলির কোন্নগরে। দিল্লির সিংহাসনে যখন বহলোল লোদি আসীন, সেইসময় ১৪৫৪ সালে নিজের বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন আশুতোষ ঘোষাল। শুধু ধর্মীয় আচার নয়, পুজোকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি চর্চার জন্য একসময় বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল ঘোষাল বাড়ির পুজো। তারই পরম্পরা বহন করে এই ঠাকুর দালানে গান গেয়েছেন বড়ে গোলাম আলি খাঁ। পদধূলি পড়েছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো নামী শিল্পীর। এই পরিবারের বংশধর পন্ডিতাচার্য সত্যেন ঘোষালের পৃষ্ঠপোষকতায় একসময় শিখর ছুঁয়েছিল নাটমন্দিরের সাংস্কৃতিক চর্চা। সেই ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব এখন তুলে নিয়েছেন তনুশ্রী, শেখর, প্রবীর ঘোষালদের মতো বর্তমান সদস্যরা। তাঁদেরই উদ্যোগে এবার ঠাকুর দালানে পরিবেশিত হবে নাটক ‘বাংলা ও বাঙালির অস্মিতা’। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল লাগাম যে বাঙালির হাতেই ছিল, তা আরও একবার ফিরে দেখবেন কোন্নগরবাসী। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ থেকে শুরু করে নেতাজির মতো চরিত্র ফুটে উঠবে নাটমন্দিরের রঙ্গমঞ্চে। পরিবারের সদস্য তিয়াসা ঘোষাল লিখেছেন এই নাটক। থাকবে অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও।
আর পাঁচটা বনেদি বাড়ির পুজোর মতোই ঘোষাল বাড়ির পুজোকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশ থেকে হজির হন পরিবারের সদস্যরা। পুজোর দিনগুলিতে শতাধিক সদস্যের পাত পড়ে এখানে। সে এক এলাহি আয়োজন।
পুজোকে কেন্দ্র করে উপচারও বিস্তর। নিয়ম মেনে মহালয়ায় দেবীর চক্ষুদান হয় এখানে। এই বাড়িতে পুজোয় বাইরের মিষ্টি ব্যবহার হয় না। পরিবারের তৈরি নারকেল নাড়ুই প্রধান মিষ্টি। সেই নারকেল আর গুড়ের পাককে কেন্দ্র করে হইচইও পারিবারিক উৎসবের অন্যতম অঙ্গ। বাড়ির পুরুষরাও বাদ যান না উপচার থেকে। বাড়ির সন্তানরা কলাপাতার প্রকোষ্ঠে মাটির প্রদীপ জ্বালেন। পুরোহিতের সঙ্গে তন্ত্রধারকও হন তাঁদেরই কেউ। দশমীতে বাড়ির মহিলারা পানতা ভাত আর ইলিশ খেয়ে দেবীবরণ করেন। সিঁদুর খেলায় রক্তিম হয় ঠাকুরদালান। পুজোপাঠের প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে মহাষষ্ঠীতে এবাড়িতে আসেন স্বয়ং রাধাকৃষ্ণ। কোন্নগর হরিভক্তি প্রদায়িনী সভার রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ এখানে পুজোর দিনগুলিতে থাকে যায়। ফের হরিসভায় ফিরে যায় একাদশীর দিন। পুজোর ক’দিন দুর্গার সঙ্গেই ভোগ নিবেদন করা হয় শ্যাম-রাইকেও।
ঘোষাল বাড়ির পুজোর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ৭৫০ টাকা পাঠাত ব্রিটিশ সরকার। তখনকার সময়ে সেই টাকা মোটে কম নয়। এমনও ঘটত, অনেকবছর সেই টাকা খরচই হতো না, তা ফিরে যেত সাহেবদের ট্রেজারিতে। সেই ব্রিটিশ শাসনও নেই, ঘোষালদের জমিদারিও এখন ইতিহাস কিন্তু রয়ে গিয়েছে পুজোকে ঘিরে রাজকীয়তার রোশনাই। এবারও ফের উৎসবের আলো জ্বালানোর জন্য কোমর বাঁধছে ঘোষাল বাড়ি। তাদেরই সঙ্গে অপেক্ষায় কোন্নগরবাসীও।