সংবাদদাতা, লালবাগ: ভিন রাজ্যে অ্যালুমিনিয়ামের বাসনপত্র ফেরি করে বিক্রি করেন বছর পয়তাল্লিশের মুকলেসুর রহমান। রুজি-রোজগারের তাগিদে বছরের বেশিরভাগ সময় স্ত্রী ছেলেমেয়েদের থেকে দূরে থাকতে হয়। বিদেশ বিভুঁইয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রমের রোজগার থেকে তিল তিল করে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে লালগোলার তারানগরে দোতলা বাড়ি তৈরি করেছিলেন। রবিবার গভীর রাত থেকে একটানা ভাঙনে রাক্ষুসে পদ্মা মুকলেসুরের বাড়ির উঠোনে এসে ফুঁসছে। যে কোনো মুহূর্তে গোটা বাড়িটাই গিলে খাবে পদ্মা। সেচ দপ্তরের এক আধিকারিক জানান, ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।
এদিকে আতঙ্কে রবিবার রাতে স্ত্রী ছেলে, মেয়ে এবং ঘরের জিনিসপত্র এক আত্মীয়ের বাড়ি রেখে আসেন মুকলেসুর সাহেব। সোমবার সকাল থেকে শাবল দিয়ে ইটের গাঁথনি ভেঙে দরজা, জানালা খুলছিলেন। ভাঙতে ভাঙতে মাঝে মাঝে চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে আসছিল তাঁর। চোখের জল সামলে মুকলেসুর বলেন, বছরের পর বছর পরিবার পরিজন ছেড়ে হাড়ভাঙা খাটুনির রোজগারের টাকায় বাড়িটা করেছিলাম। পদ্মা যেভাবে এগিয়ে আসছে তাতে রেহাই মিলবে বলে মনে হয় না। সেই কারণে যতটুকু পারছি বাঁচানোর চেষ্টা করছি। একই পরিস্থিতি প্রতিবেশী মেহেবুব আলম, আশাদুল শেখ, মাহাবুল শেখেরও। পেশায় রাজমিস্ত্রী আশাদুল। রবিবারের রাতের ভাঙনে আশাদুলের শৌচালয় এবং টিউবওয়েল নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। বর্তমানে পদ্মা আশাদুলের উঠোন দিয়ে বইছে। মাহাবুল শেখের দোতলা বাড়িও পদ্মার গর্ভে যাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিক নদী ভাঙনে শতাধিক বাড়ি, বিঘের পর বিঘে চাষের জমি, আম-লিচু বাগান নদীগর্ভে বিলীন হয়। মাথার ছাদ হারানো অধিকাংশ পরিবার এখনও ত্রাণ শিবিরে রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মহম্মদ জাকারিয়া বলেন, গত বছরের ভাঙনে মাথার উপর ছাদ হারিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে ত্রিপল খাটিয়ে রয়েছি। সরকারি জমি পাট্টা পেলেও সেই নিচু জলা জমিতে ঘর করতে পারিনি। তারানগরের বাসিন্দা শ্যামল ঘোষের মুদিখানার দোকান রয়েছে রাধাকৃষ্ণপুরে। শ্যামলবাবুর অবস্থা এখন শাঁখের করাতের মতো। বাড়ি এবং দোকানের কয়েক ফুট দূরে পদ্মা বইছে। পদ্মা যেভাবে ভেঙেচুরে এগিয়ে আসছে তাতে দু-এক বছরের মধ্যে রাধাকৃষ্ণপুর এবং তারানগর গ্রাম দুটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
লালগোলার বিধায়ক আব্দুল আজিজ বলেন, তারানগর এবং পার্শ্ববর্তী রাধাকৃষ্ণপুরে ভাঙন শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সেচ দপ্তর এবং প্রশাসনের সঙ্গে বেশ কয়েকদফা কথা হয়েছে। ভরা নদীতে কাজ করা যাবে না। জল কমলেই ভাঙন রোধের কাজ শুরু হবে।
তারানগরের পাশাপাশি রাধাকৃষ্ণপুরে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে বেশ কয়েকটি বাড়ি এবং দোকান তলিয়ে গেছে। এলাকাবাসীর যারাযাতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম বিএসএফ রাস্তার বেশ কিছুটা অংশ পদ্মায় চলে গিয়েছে। রবিবার রাতের ভাঙনে রাধাকৃষ্ণপুরের সুফল সিংহ,বিবেক দাস, সুবোধ সিংহের পাকা বাড়ি নদী গর্ভে। রবিবার রাতের ভাঙনে রীতিমতো দিশেহারা পদ্মা পাড়ের দুই গ্রামের কয়েক’শো পরিবার। ফিবছর ভাঙন এবং তার ফলে নদী পাড়ের বাসিন্দাদের দুর্গতির জন্য স্থানীয় প্রশাসন থেকে জনপ্রতিনিধিদের দায়ী করেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সুখা মরসুমে কাজ না করে বর্ষার মরসুমে কাজ করা হয়। যার ফলে প্রতিবছর ভাঙন হচ্ছে।