


নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: ২২০ মিটার লম্বা পাটের রশি। সেটি একবার ছুঁলেই ভক্তের পুণ্যার্জন হয়। পুরীর ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার রথযাত্রায় রথ টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে রশি ব্যবহৃত হয়, একসময় সেটি তৈরি হতো হাওড়াতেই। জাতীয় সড়কের পাশে আলমপুরে একটি বেসরকারি কারখানায় সেই বিশেষ রশি তৈরির জন্য দিনরাত এক করতেন শ্রমিকরা। কাজ দেখতে ভিড় করতেন সাধারণ মানুষও। করোনাকাল থেকে দড়ির বরাত আসা বন্ধ। অবহেলায় অযত্নে নষ্ট হয়ে গিয়েছে মেশিন।
১৯৭১ সাল থেকে হাওড়ার আলমপুরের এই বেসরকারি কারখানায় তৈরি হতো পুরীর রথের রশি। রথযাত্রার একমাস আগেই বরাত আসত পুরী থেকে। বরাত পেতেই সবচেয়ে ভালো মানের পাট আনা হতো কারখানায়। বিশেষ একধরনের মেশিনে সেই পাট থেকে ২২০ মিটার দীর্ঘ রশি প্রস্তুত করা হতো। রশি তৈরির সময় মেশিন চালাতে একসঙ্গে প্রায় কুড়িজন শ্রমিকের প্রয়োজন হতো। একসপ্তাহের মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে যেত সম্পূর্ণ রশি। এরপর পুরীর মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফে পাঠানো লরিতে করেই সেটি যেত জগন্নাথধামে। সেসব এখন অতীত। ২০২০ সাল থেকে রশির বরাত আর আসেনি পুরী থেকে। পাশাপাশি গত কয়েকবছরে সেই ধরনের রশি আর প্রস্তুত করা হয় না এখানে। শ্রমিকের সংখ্যাও কমে গিয়েছে। এদিকে বৃষ্টির জল ঢুকে, মেরামতির অভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছে সেই রশি তৈরির মেশিনও। দুটি মেশিন ইতিমধ্যেই কোম্পানি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে।
কারখানার ম্যানেজার আব্দুল হালিম বলেন, ‘প্রায় ৬০ বছর ধরে আমরা পুরীর রথের রশি তৈরি করছিলাম। সেটি তৈরি করতে শ্রমিকদের মধ্যে চরম উৎসাহ থাকত। জগন্নাথদেবের রশি প্রস্তুত মানেই যেন উৎসবের আবহ তৈরি হতো কারখানায়।’ ১৯৭৮ সাল থেকে এই কারখানায় কাজ করছেন কেনারাম দাস। তিনি বলেন, ‘পুরীর বরাত এলে বাড়তি মজুরি মিলত। মেশিনে যাতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা না দেয় তার জন্য সবসময় সতর্ক থাকতে হতো। পুরীর রথের রশি তৈরি করাটাও ছিল পুণ্যের বিষয়।’ স্থানীয় বাসিন্দা ঋতব্রত ভৌমিকের কথায়, ‘ছোটবেলায় দাদা, কাকুরা এই কারখানায় কাজ করতেন। আমার মতো, গ্রামের অনেকেই আসত কারখানায় রশি তৈরি দেখতে। তখন সেই রশি ছুঁয়ে প্রণাম করতাম আমরা।’