


কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য। তারই সন্ধানে ছুটে বেড়ায় ভ্রমণ পিয়াসী মন। তাই তো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে উড়ে চলা। দলবদ্ধভাবে কিংবা একা।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: অনেক দিন থেকেই শুনে আসছি মরিশাস দেশটা হল বিত্তশালী মানুষদের। বিশেষত চলচ্চিত্র জগতের সেলিব্রিটিদের প্রমোদ ভ্রমণের জায়গা। বিভিন্ন কাগজে, ফিল্ম ম্যাগাজিনে তাঁদের সে সব ছবি ছাপা হয়। আমি অবশ্য বিত্তশালীও নই। আমার বাহুল্য বর্জিত পথচলা। এর একটা ভালো দিক আছে। নতুন দেশের সাধারণ জনজীবনের সঙ্গে মিশে যেতে পারি, কাছ থেকে দেখতে পারি তাদের জীবনযাত্রা। ভ্রমণ মানে তো শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খোঁজা বা স্থাপত্য দেখা নয়, মানুষও দেখা।
আমার মরিশাস ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য অবশ্য ছিল একটি অ্যাডভেঞ্চার— ‘ওয়াক উইথ দ্য লায়ন’ প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য। এ দেশের এক অ্যাডভেঞ্চার পার্কে সিংহের সঙ্গে হাঁটার সুযোগ মেলে। মাত্র তিন দিনের জন্য ভ্রমণ। ফ্লাইট ধরেছিলাম দিল্লি থেকে। সেখান থেকে রিয়াধ পৌঁছে আফ্রিকার এই দ্বীপ রাষ্ট্রের রাজধানী পোর্ট লুইসের রামগুলাম বিমানবন্দরে যখন নামলাম তখন সদ্য ভোরের আলো ফুটেছে। ছোট বিমান বন্দর। সুন্দরভাবে সাজানো। বর্তমানে সমুদ্র ঘেরা এই দ্বীপ রাষ্ট্রে প্রবেশ করার জন্য ভিসা লাগে না। অর্থাৎ আপনি শুধু পাসপোর্ট নিয়েই নামতে পারেন। এই ভিসা না লাগার ব্যাপারটা আসলে আংশিক সত্য। সে দেশের ভিতর প্রবেশ করতে হলে অনুমতিপত্র অবশ্যই লাগে, যাকে বলা হয় ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’। এয়ারপোর্টে নেমে সেই ভিসা আপনাকে নিতে হয় নির্দিষ্ট ফর্ম ফিলআপ করে। এবং তার জন্য টাকাও দিতে হয়। অবশ্য, ই-ভিসা আমার করাই ছিল। ইমিগ্রেশনে একপ্রস্থ চেকিং হওয়ার পর যখন আমি কাচের দরজা ঠেলে এয়ারপোর্টের বাইরে বেরতে যাচ্ছি, ঠিক তখনই বিপত্তি ঘটল। পিছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল ‘এক্সকিউজ মি’।
ফিরে তাকাতেই একজন ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনার লাগেজ আর পাসপোর্টটা আর একবার দেখব।’ তার পোশাক আর কথা শুনেই বুঝতে পারলাম ইনি কাস্টমসের লোক। এগিয়ে গেলাম তার কাছে। সে আমাকে নিয়ে গেল স্ক্যানার মেশিনের কাছে। বার কয়েক আমার কেবিন লাগেজটা মেশিনের মধ্যে দিয়ে চালনা করল। তারপর লাগেজ খুলে দেখাতে বলল, দেখালাম। এখানেই ঘটনার শেষ হল না। তারা আমার পাসপোর্ট খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল। হোটেল বুকিং, যে প্রোগ্রামে আমি যোগ দিতে এসেছি তার কাগজপত্র ইত্যাদি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখল। কিন্তু তাতেও নিষ্কৃতি মিলল না। সেই লোকটি আমাকে নিয়ে গেল একটা ঘরে। যেখানে আরও কয়েকজন পুরুষ-মহিলা কাস্টমস অফিসার আছে। তারা আমাকে নানা প্রশ্ন করতে লাগল কখনও হিন্দিতে, কখনও ইংরেজিতে। নানা রকমের সব অদ্ভুত প্রশ্ন। আমার সঙ্গে কোনও সঙ্গিনী নেই কেন? এ দেশে তো কেউ একা বেড়াতে আসে না! এত দেশ থাকতে আমার মরিশাসেই আসার ইচ্ছা হল কেন? এমনকী একসময় তারা আমাকে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে লাগল, যা তাদের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এ যেন রীতিমতো হ্যারাসমেন্ট। ইতিপূর্বে কখনও এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়িনি। আমি দেশের বাইরে কোথাও গেলে সে দেশের ভারতীয় দূতাবাসের ঠিকানা, ফোন নম্বর, মেল অ্যাড্রেস সংগ্রহ করে রাখি। কারণ, কোনও অবাঞ্ছিত বিপদ ঘটলে দূতাবাসই নিজের দেশের নাগরিককে রক্ষা করার চেষ্টা করে। আমি শেষ পর্যন্ত তাদের বললাম, আমার সঙ্গে সব বৈধ কাগজপত্র আছে, আপত্তিকর বা বে-আইনি কোনও জিনিস নেই, আমি কোনও আইন ভঙ্গ করিনি, তবু তোমরা আমাকে হ্যারাস করছ, আমার সময় নষ্ট করছ। আমি এবার ভারতীয় দূতাবাসে মেল করে আমার পরিস্থিতি আর অভিযোগ জানাতে বাধ্য হব। এতেই কাজ হল। তারা আমার পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিল। পরে একজনের মুখে শুনেছি এই এয়ারপোর্টে এ ব্যাপারটা নাকি অনেক সময়ই ঘটে থাকে। বৈধ কাগজ থাকলেও অনেকে জেরার মুখে ভয় পেয়ে যায়, তখন তাদের কাছে অর্থ দাবি করা হয় নিষ্কৃতি দেওয়ার জন্য। দুর্নীতি তো সব দেশেই কমবেশি আছে। অনেকেই প্রভূত অর্থ নিয়ে এ দেশে প্রমোদ ভ্রমণে আসে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগায় কিছু অসাধু মানুষ। যাইহোক, কিছুটা তিক্ত মন নিয়েই এয়ারপোর্টের বাইরে পা রাখলাম।
আমাকে দেখে ঘিরে ধরল ট্যাক্সি ড্রাইভাররা। একজন হিন্দিভাষী ড্রাইভারের সঙ্গে কথাবার্তা দরদাম সেরে তার ট্যাক্সিতেই উঠে বসলাম আমার রিসর্টে যাব বলে। গাড়িতে ওঠার পরই হিন্দি গান চালিয়ে দিল লোকটা। মসৃণ রাস্তা ধরে চলতে শুরু করল গাড়ি। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি পাম গাছ আর আধুনিক স্থাপত্য বা কোথাও ফরাসি স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত সুন্দর সুন্দর বাড়ি-ঘর। একসময় ফরাসিদের উপনিবেশ ছিল আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের কাছে ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত এই দেশটি। তার চিহ্ন এখনও এ দেশের বুকে রয়ে গেছে। আমার রিসর্টের অবস্থান শহরের বাইরের দিকে সমুদ্রের পাড়ে। কিছুটা এগতেই এক জায়গায় দেখলাম বিরাট প্যান্ডেল খাটানো হয়েছে। তাতে আছে শিবের মূর্তি। বহু মানুষের সমাগম সেখানে। মাইকে তারস্বরে ভোজপুরি গান বাজছে। এ যেন আমাদেরই দেশ। ড্রাইভার জানাল, আজ শিবরাত্রি। এ দেশে মহাসমারোহে এ দিনটি পালন করা হয়। মরিশাসের জনসংখ্যার প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ হিন্দু এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশই হিন্দিভাষী। চলতে চলতে একসময় দু’পাশে শুরু হল দিগন্ত বিস্তৃত আখের খেত। ফরাসি উপনিবেশকালে একসময় এই আখের খেতেই শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে এসেছিল ভারত ভূখণ্ডের উত্তরপ্রদেশ, বিহারের মানুষেরা। তারপর তাদেরই বংশধররা এখানে রয়ে গিয়েছে পাঁচ-সাত প্রজন্ম ধরে। সেই আখের খেত শেষ হওয়ার পর আমরা সমুদ্রের পাশে এসে উপস্থিত হলাম। শান্ত নীল জলরাশি তার। তার গা ঘেঁষে রাস্তা এগিয়েছে। রাস্তার অন্যপাশে গাছে ঘেরা ছোট-বড় হোটেল-রিসর্ট। গাছের ছায়াময় শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। এ জায়গাতে পৌঁছেই যেন মন থেকে সব তিক্ততা, ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। আজকের দিনটা আমার হাতে আছে পোর্ট লুইস ঘুরে দেখার জন্য। ড্রাইভারের সঙ্গেই কথা বলে নিলাম পোর্ট লুইস শহরটা ঘুরে দেখার জন্য। পৌঁছে গেলাম রিসর্টে। ড্রাইভার আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল এক ঘণ্টা পর ফিরে আসবে বলে।
রিসর্টে চেকইন করে পোশাক পাল্টে নিলাম। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম পোর্ট লুইস দেখব বলে। রাস্তা, ক্ষুদ্র বালুতট পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম সামনের শান্ত সমুদ্রের ধারে। পায়ের সামনে বালুতট ছুঁয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের জল। তবে পাড়ের দিকে সমুদ্রের জল শ্যাওলা সবুজ। লোকজন খুব একটা নেই। এক ভদ্রমহিলাকে সামনে পেয়ে তাকে আমার মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলে দিতে বললাম। সে ছবি তুলে বলল, এক ডলার দাও। আমি ভাবলাম সে মজা করছে। আমি হাসলাম। সে অবশ্য এরপর আর দাঁড়াল না। কিন্তু একটু পরই এক শ্বেতাঙ্গ ভদ্রলোক, সম্ভবত সে ফরাসি, তাকে দিয়ে আমার ছবি তোলাবার পর সেও পূর্বের ভদ্রমহিলার মতো একই দাবি করে বসল এবং জানাল, এখানকার এটাই নিয়ম। বিনা পয়সায় কেউ কোনও কাজ করে না। কাজেই এক ডলার দিতে হল তাকে। এরপর গাড়ি এসে গেল। আমি রওনা হলাম পোর্ট লুইস শহরের দ্রষ্টব্যগুলো দেখার জন্য।
এ শহরের রাস্তাগুলো বেশ প্রশস্ত আর ঝকঝকে তকতকে। রাস্তার পাশে বৃক্ষরোপণের ফলে দৃশ্যপটও বেশ মনোমুগ্ধকর। আমার প্রথম কাজ ছিল ডলার ভাঙিয়ে মরিশীয় টাকা জোগাড় করা। এদেশের মুদ্রায় ডোডো পাখির ছবি আছে। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই ডোডো পাখির শেষ আবাসস্থল ছিল মরিশাস দ্বীপ। ডোডো ছিল ভারী মাংসল চেহারার উড়তে না পারা পাখি। সহজেই মানুষের শিকার হতো তারা। এই বিলুপ্ত পাখি এখন এ দেশের প্রতীক চিহ্ন। পাহাড় আর সমুদ্র ঘেরা শহর পোর্ট লুইস। এই শহরে এখনও কিছু ফরাসি মানুষ বাস করে। তবে জাত্যাভিমানের কারণে নাকি সেই সব সাদা চামড়ার মানুষজন সাধারাণত কালো চামড়ার মানুষদের সঙ্গে মেশে না। চারপাশ দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম পোর্ট লুইস বন্দরে। যার নাম অনুসারে এ শহরের নামকরণ। তিনশো বছর আগে এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই এ শহরের জন্ম হয়। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে সংযোগ রাখত এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। ফরাসিরা এ বন্দরের নামকরণ করেন ফরাসি সম্রাট পঞ্চদশ লুইয়ের নাম অনুসারে। সমুদ্রের জল এখানে বেশ গভীর বলে বেশি দূরে জাহাজ নোঙর করতে হয় না। সার সার জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের নীল জলে। তবে সেই এলাকায় প্রয়োজন ছাড়া বাইরের লোককে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখলাম, কাছাকাছি উন্মুক্ত বেলাভূমি। তবে পোর্ট লুইসের এ অংশতে জলে নামা নিষেধ। সাইন বোর্ডে হাঙরের ছবি দিয়ে লেখা আছে সে কথা। কারণ মাঝেমধ্যেই হাঙরের দেখা মেলে এ দিকে। স্নান করার জন্য সমুদ্র সৈকত হল যে দিকটাতে আমার রিসর্টের অবস্থান সে দিকে। পকেটে রেস্ত থাকলে অবশ্য বন্দর সংলগ্ন অঞ্চল থেকে প্রমোদতরীতে ভেসে যাওয়া যায় সমুদ্রের বুকে।
পোর্ট লুইস বন্দর ঘুরে দেখার পর রওনা হলাম পরবর্তী গন্তব্য ‘ন্যারাচাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম’ দেখব বলে। গাছে ছাওয়া জায়গার মধ্যে একটা সাদা রঙের দ্বিতল ভবনের মধ্যে গড়ে উঠেছে এই মিউজিয়াম। মিউজিয়ামের ভিতর ঢুকে দেখলাম, মূলত এই দ্বীপভূমির নানা পশুপাখি আর সামুদ্রিক প্রাণীর দেহ স্টাফ করে রাখা আছে নানা গ্যালারিতে। তবে এই মিউজিয়ামের সবচাইতে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হল ডোডো গ্যালারি। যে কারণে স্থানীয় লোকেরা এই মিউজিয়ামকে ‘ডোডো মিউজিয়াম’ নামেই ডাকে। প্রবেশ করলাম ডোডো গ্যালারিতে। ডোডো পাখির অসংখ্য ছবি, তাদের সম্পর্কে নানা তথ্য সুন্দরভাবে সাজানো আছে। পঞ্চদশ শতকে স্পেনিয়ার্ডরা যখন এ দ্বীপে আসে তখন থেকেই না উড়তে পারা পনেরো কেজির ওজনের এই পাখির নিধন যজ্ঞ শুরু হয় মাংসের লোভে। শেষ জীবন্ত ডোডো পাখি এ দ্বীপে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল সাড়ে তিনশো বছর আগে। মাত্র দেড়শো বছরের মধ্যেই এ দ্বীপের প্রাচীন বাসিন্দা ডোডো পাখিদের বিদায় নিতে হয় মানুষের লোভের কারণে। এই মিউজিয়ামে রয়েছে ডোডো পাখির একটা কঙ্কাল এবং চারশো বছরের প্রাচীন একটা স্টাফ করা ডোডো পাখির দেহ। যা একসময় এক ব্যক্তিগত সংগ্রহশালাতে ছিল।
বেলা বাড়ছে। এরপর গাড়ি আমাকে নিয়ে রওনা হল ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট হিসাবে ঘোষিত ‘আপ্রবাসী ঘাটের’ উদ্দেশে। নীল সমুদ্রের বালুতটের গা বেয়েই খাড়া পাহাড় ওপর দিকে উঠে গেছে এখানে। গুহা সমৃদ্ধ পাহাড়ে ট্রেক করে ওঠা যায়, তবে তার জন্য এ জায়গার একটা ছোট অফিস থেকে অনুমতি নিতে হয়। অসংখ্য গুহা আছে এ পাহাড়ে। নীল আকাশ, সমুদ্র আর পাহাড় মিলেমিশে এক আশ্চর্য সুন্দর পরিবেশ চারপাশে। তবে এ জায়গার এক করুণ ইতিহাসও আছে। ফরাসিরা এক সময় এ দ্বীপে দাস ব্যবসা করত। আখের খেতে তাদের কাজ করানো হতো। অনেক সময় ক্রীতদাসরা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিত এই পাহাড়ে। অনুসন্ধানকারীরা তাদের খুঁজে বের করতে পারলে পাহাড়ের ওপর থেকে নীচে ঠেলে ফেলে অথবা গুলি চালিয়ে হত্যা করত। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে কাটানোর পর গাড়ি আমাকে নিয়ে গেল শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এক বাজারে। নানা ধরনের দোকান আছে সেখানে। বহু বিদেশি ট্যুরিস্টদের ভিড়ও আছে। বিকেল হয়ে গিয়েছে। গাড়ি আমাকে পৌঁছে দিল রিসর্টের গেটে। ভিতরে না ঢুকে আমি এগলাম সমুদ্রের দিকে। সমুদ্রের বুকে সূর্যাস্তের শোভা উপভোগ করব বলে। ইতিমধ্যে সূর্য ঢলতে শুরু করেছে সমুদ্রের বুকে। দেখি, এক শ্বেতাঙ্গী বৃদ্ধা সমুদ্রে স্নান করতে নেমেছেন। কিছুক্ষণ পর সেই ভদ্রমহিলা জল থেকে উঠে এসে নিজেই আমার সঙ্গে পরিচয় করতে এগিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আমি কোন দেশ থেকে এসেছি? কেন এসেছি? আমিও তাঁকে একই প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, ‘আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছি। আমার বয়স সুইট এইট্টি। এ দেশে বেড়াতে এসেছি।’ তাঁর সঙ্গীরা কোথায়, জানতে চাওয়াতে তিনি জবাব দিলেন, ‘আমার তো কোনও সঙ্গী নেই। আমি একাই বেড়াতে এসেছি।’
আমি বেশ অবাক হলাম তাঁর কথা শুনে। অনেকেই তো এ বয়সে কলকাতা থেকে কৃষ্ণনগর যাওয়ার আগে পাঁচবার ভাবেন। বৃদ্ধা আমার মনের ভাব পাঠ করতে পেরে বললেন, ‘তুমি ভাবছ আমি একলা এ বয়সে এত দূর ঘুরতে এসেছি বলে আমার বিপদ হতে পারে? কিন্তু পৃথিবীর যেকোনও জায়গাতেই তো যেকোনও মুহূর্তে মানুষের জীবনে বিপদ নেমে আসতে পারে। এখানেও পারে, আমার সিডনির অ্যাপার্টমেন্টেও পারে। তাই যতদিন সক্ষম আছি ততদিন দু’চোখ ভরে দেখে যেতে চাই সুন্দর পৃথিবীটাকে।’
দিন শেষের বিদায়ী সূর্যের আলো এসেছে বৃদ্ধার মুখমণ্ডলে। আমার মনে হল তাঁর মুখমণ্ডল যেন নিছক বৃদ্ধার মুখ নয়, তার আড়াল থেকে যেন উঁকি দিচ্ছে প্রাণ স্পন্দনে ভরপুর অষ্টাদশী যুবতীর মুখ। এর নামই তো জীবন, এর নামই তো বাঁচা। চরৈবেতি।