শোভন চন্দ, কলকাতা: লাল মেঝে আর সবুজ জাফরির নস্টালজিয়া। দালানের একদিকে প্রতিমা তৈরিতে মগ্ন শিল্পী। অন্যদিকে মেঝে ধুয়ে-মুছে চলছে পরিষ্কারের কাজ। উপরে উন্মুক্ত আকাশে খেয়ালখুশি মতো ভেসে বেড়াচ্ছে টুকরো টুকরো সাদা মেঘ। আর সেই মুলুক থেকেই শরতের বার্তা এসে পৌঁছেছে ভবানীপুরের মোহিনী মোহন রোডের মল্লিকবাড়ির দরজায়। দেখতে দেখতে একশো বছর পার করে ফেলেছে রঞ্জিত মল্লিক ও কোয়েল মল্লিকের বাড়ির দুর্গাপুজো। এবারও জোরকদমে চলছে প্রস্তুতি।
মল্লিক পরিবারের আদি নিবাস ছিল গুপ্তি পাড়ায়। সেখানেও পুজো হত। ১৯২৫ সালে ভবানীপুরের মল্লিকবাড়িতে পুজো শুরু করেন রাধাগোবিন্দ মল্লিকের পুত্র সুরেন্দ্র মাধব মল্লিক। জন্মাষ্টমীর সময় কাঠামো পুজো হয়। ধীরে ধীরে ঠাকুর দালানে একচালায় ডাকের সাজে সেজে উঠেন মা। শতাব্দী প্রাচীন রীতি মেনেই হয় কলাবউ স্নান, কুমারী পুজো ও সন্ধিপুজো। ঠাকুরকে লুচি, নানারকম ভাজা, মিষ্টি, নাড়ু, ফল ইত্যাদি দেওয়া হয়। আগে নবমীর রাতে নানারকম অনুষ্ঠান হত। নাচ, গান নাটক আরও কত কী। বাড়ির উঠোনে বড়ো-ছোটো সবাই মিলে পাণ্ডব কৌরব, বিরিঞ্চিবাবা, চলচিত্ত চঞ্চরী, ভাড়াটে চাই সহ নানা ধরনের নাটক পরিবেশন করত। এখন সেই আমেজ নেই। তবে একসঙ্গে মহানন্দে পুজোয় শামিল হন সকলে।
দশমীতে বাড়ির সধবা মহিলারা মাকে বরণ করে নেন। মন খারাপ আর পরের বছরের অপেক্ষা শুরু। এরইমাঝে দীর্ঘদিনের রীতি মেনে মায়ের বিদায়ের পর হয় আমিষ ভোজন। পাত পেড়ে চলে খাওয়া দাওয়া। আর এখানে সিগনেচার ডিশ মেটে চচ্চড়ি। মল্লিকবাড়ির প্রবীণ সদস্য রণজিৎ মল্লিকের কথায়, ‘প্রতি বছর এই সময়টা পুরো বাড়ি জমে ওঠে। কোয়েল, রঞ্জিত আসে। নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আত্মীয়স্বজনরাও আসেন। দিনগুলি কীভাবে কেটে যায় বুঝতে পারি না।’
পুজো মানেই হারানো শৈশবে ফিরে যাওয়া। একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠা। সেকথাই বলছিলেন মল্লিকবাড়ির অন্যতম সদস্য অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক। কিছুটা নস্টালজিক হয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্গাপুজো মানেই তো হইহই, ধুমধাম। বাড়িতে তা শুরু হয়ে গেছে। পুজোর এই ক’টা দিন পরিবারের সকলের সঙ্গে দেখা হয়। কত গল্প হয়। সকলে মিলে ভোগ খাওয়া। নাতি-নাতনির সঙ্গেই কেটে যায়। এবার মহানায়কের জন্ম শতবর্ষ। কিছু মনে পড়ছে? আবেগতাড়িত হয়ে রঞ্জিতবাবু বলে উঠলেন, হ্যাঁ। এবছর তো উত্তমদার শতবর্ষ। মল্লিকবাড়ির দুর্গাপুজোতে উনি এসেছিলেন একবার। তখনও আমি সিনেমায় আসিনি। ‘নায়ক’ ছবির শ্যুটিং করতে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন সত্যজিৎ রায়। ফ্ল্যাশব্যাকের সিনটা, যেখানে দুর্গাপুজোর সময় শংকরদার হার্ট অ্যাটাক হবে। সেই দৃশ্যটা মল্লিকবাড়িতে শ্যুট করা হয়েছিল। সেই সিনের জন্য আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন উত্তমদা। আমার তখন ২০ বা ২১ বছর বয়স। দুর্ভাগ্য, সেদিন ওঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। পরে আমি যে ছ’বছর ওঁর সঙ্গে টানা কাজ করেছি, কোনোবার ওঁকে মল্লিকবা়ড়ির দুর্গাপুজোতে আনতে পারিনি। এখনও এই আপসোসটা থেকে গিয়েছে।’



