


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম ছিল। ‘ম্যাপিং’ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ডাক আসেনি শুনানির। তবুও চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় (প্রথম পর্ব) ‘ডিলিটেড’ হয়ে গিয়েছেন মানিকতলা বিধানসভার ২২৩ নম্বর পার্টের ভোটার অঞ্জলি সরকার! চিন্তায় ঘুম উড়েছে কাঁকুড়গাছির বসাকবাগানের বাসিন্দা অঞ্জলিদেবীর। তাঁর ছেলে কৃষাণু সরকার বলেন, ‘মায়ের নাম দিয়ে আমি ফর্ম পূরণ করেছিলাম। আমার নাম চলে এল। অথচ মায়ের নাম নেই! অদ্ভুত কাণ্ড।’ মানিকতলা বিধানসভার এই পার্টেরই ভোটার অভিষেক বসাক। কমিশন প্রকাশিত খসড়া তালিকায় তাঁকে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছিল। বিএলও-কে বলে সমস্ত কাগজপত্র জমা করেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘বিএলও বলেছিলেন, কোনো চিন্তা নেই। চূড়ান্ত তালিকায় নাম এসে যাবে। কিন্তু এখন দেখছি, আমার নাম ডিলিট!’ দুশিন্তা তাঁকে ঘিরে ধরেছে। এমন এক-দু’টি নয়! মানিকতলা বিধানসভার শুধু ২২৩ নম্বর পার্টেই ২৭৪ জন ‘জীবিত’ ভোটারকে ‘ডিলিটেড’ দেখানো হয়েছে বলে জানাচ্ছেন কলকাতা পুরসভার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার শান্তিরঞ্জন কুণ্ডু।
শহরজুড়ে কমবেশি এমন নানা অসঙ্গতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। চূড়ান্ত তালিকায় নামের উপর ‘ডিলিটেড’ বা ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ (বিচারাধীন) লেখা দেখে বিস্মিত অনেকে। সটান ফোন করছেন বিএলও-কে। তাঁর কাছেই জবাব চাইছেন, কেন এমন হল? বহু ক্ষেত্রে বিএলওদের রীতিমতো গালাগালি শুনতে হচ্ছে বলে খবর। একের পর এক ‘ডিলিটেড’ ভোটারের ফোনে জর্জরিত, দিশেহারা বিএলওরা। কেউ ছুটছেন কাউন্সিলারের কাছে। কেউ আবার ফর্ম ৬ পূরণের মাধ্যমে নতুন করে ভোটার হওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছেন। এই আবহে কোনো কোনো আলোচিত কেন্দ্রে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যাও চোখ কপালে তোলার মতো। যেমন ভবানীপুর, কলকাতা বন্দর, বালিগঞ্জ, কসবা কিংবা এন্টালি ইত্যাদি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা অনেক। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র ভবানীপুরে ১৪,১৫৪ জনের নাম রয়েছে এই তালিকায়। কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের বিধানসভা কেন্দ্র কলকাতা বন্দরে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা ৩২,৩৭৮। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, বেছে বেছে তৃণমূলের কোর ভোটার কিংবা সংখ্যালঘু ভোটারদের টার্গেট করে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বা বিচারাধীনের তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফিরহাদ হাকিম বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের টার্গেট করা হয়েছে, এটা স্পষ্ট। বিজেপির নির্দেশে নির্বাচন কমিশন বৈধ মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ দিয়েছে। আমার এলাকায় যেসব বুথে বা পার্টে মুসলিম ভোটার বেশি, সেখানে বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যাও তত বেশি। মানুষকে হিয়ারিংয়ের নামে লাইনে দাঁড় করিয়ে সমস্ত নথি নিয়েও নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। এভাবে বৈধ ভোটারদের হেনস্তা মেনে নেওয়া হবে না।’ কসবা এলাকায় বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা ১৯,১৮১। বালিগঞ্জে সংখ্যাটা ২৩,৯৬৮। আর এন্টালিতে প্রায় ১৩ হাজার ভোটার বিচারাধীন তালিকায় রয়েছেন।
প্রথম ধাপের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর আরও নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে। যেমন, বেহালার ১৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৫২ নং পার্টের ভোটার মিরাজ আহামেদ, ১১০ নং পার্টের অপর্ণা ভট্টাচার্য বা ১১১ নম্বর পার্টের শ্যামলকৃষ্ণ দাস দিব্য বেঁচেবর্তে থাকলেও ‘ডিলিটেড’ হয়েছেন। ৫৪ বছর বয়সি অপর্ণাদেবী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি কি বাংলাদেশি নাকি অনুপ্রবেশকারী? সব প্রামাণ্য নথি জমা দিয়েছি। আমার নাম কেন বাদ দিল ওরা?’