Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬

ড্রিমলাইনার বিপর্যয়ের রিপোর্টেও বাড়ছে রহস্য

দুপুর ১টা ৩৮ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে টেক অফ ডিসিশন স্পিড পৌঁছে গেল ১৫৩ নটসে। অর্থাৎ ঘণ্টায় ২৮৩ কিমি। ঠিক এই গতিতে পৌঁছলেই টেক অফ করতে হয় পাইলটকে।

ড্রিমলাইনার বিপর্যয়ের রিপোর্টেও বাড়ছে রহস্য
  • ১৩ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পাইলট : এ কী... ফুয়েল সুইচ কাট অফ করেছ কেন!    কো-পাইলট: আমি তো করিনি

নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: দুপুর ১টা ৩৮ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে টেক অফ ডিসিশন স্পিড পৌঁছে গেল ১৫৩ নটসে। অর্থাৎ ঘণ্টায় ২৮৩ কিমি। ঠিক এই গতিতে পৌঁছলেই টেক অফ করতে হয় পাইলটকে। এবং টেক অফ করেই গতি পৌঁছয় ঘণ্টায় ৩৩৩ কিলোমিটারে। বিমানের নোজ ঊর্ধ্বমুখী। এবার ল্যান্ডিং গিয়ার গুটিয়ে নেওয়া হবে। ফ্ল্যাপস বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে এসব কিছুই হল না! হঠাৎ পা‌ইলট ক্যাপ্টেন সুমিত সাভারওয়াল দেখলেন, ইঞ্জিন ওয়ান এবং টু দুটোই রান থেকে কাট অফ মোডে চলে গিয়েছে। ২৪২ জন যাত্রী ও বিমান ক্রু তখনও জানেন না, কী ঘটছে ককপিটে। কো পাইলট ফার্স্ট অফিসার ক্লাইভ কুন্দেরকে চিৎকার করে ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ কী... ফুয়েল সুইচ কাট অফ করেছ কেন?’ তৎক্ষণাৎ হতচকিত নার্ভাস কণ্ঠ শোনা গেল কো-পাইলটের। তিনি বলছেন, ‘আমি তো বন্ধ করিনি!’ ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার থেকে জানা যাচ্ছে, ঠিক এক সেকেন্ডের ব্যবধানে আবার দুই ইঞ্জিন চালানো হয়েছিল। অর্থাৎ রান মোড। কিন্তু চালু হলেও এক সেকেন্ডের ব্যবধানে ফের বন্ধ দুই ইঞ্জিন। স্পিড ড্রপ করছে! ফ্রন্ট ফ্যান, কমপ্রেসর এবং টার্বাইন—প্রতিটি প্যারামিটার নিস্তেজ হচ্ছে। ১টা ৩৮ মিনিট ৫২ সেকেন্ড। চালু করার চেষ্টা হচ্ছে এক নম্বর ইঞ্জিন। ১টা ৩৮ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড। সামান্য যেন আশার আলো। এয়ারক্র্যাফ্টের এফএডিইসি সিস্টেম ইঞ্জিন টু’কে কিছুটা যেন বাঁচিয়ে তুলছে! একটু সময় চাই পাইলটের। তাহলেই অন্তত যেখানে হোক ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং করাতে পারবেন।

Advertisement
১২ জুন ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং হয়নি। ভয়াবহ এক বিস্ফোরণ। আর মৃত্যুমিছিল। সেইসঙ্গে প্রশ্ন—কে বন্ধ করেছিল দুই ইঞ্জিনের ফুয়েল সুইচ? পাইলট এবং কো-পাইলট কেউ নয়। ককপিট ভয়েস রেকর্ডার থেকে সেই বার্তাই পাওয়া গিয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়া ১৭১’এর বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার ক্র্যাশের প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে এক মাস পর। শুক্রবার গভীর রাতে। কিন্তু এয়ারক্র্যাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর তদন্ত রিপোর্ট দুর্ঘটনার মূল কারণ দর্শানোর থেকেও যেন রহস্যের জট বৃদ্ধির দিকেই আঙুল তুলছে। ইঞ্জিন বন্ধ এবং চালুর জন্য ড্রিমলাইনারে যে সুইচ থাকে, অতিরিক্ত সুরক্ষার লক্ষ্যে সেটির উপরও থাকে একটি করে বিশেষ শিল্ড। থাকে ডিজিটাল লক। অর্থাৎ ‌ইনফ্লাইট অবস্থায় ওই শিল্ড ডিজিটালি সরিয়ে ম্যানুয়ালি সুইচ বন্ধ অথবা চালু করতে হবে। যাকে পরিভাষায় বলা হয় কাট অফ এবং রান। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফুয়েল সুইচ অফ হয়ে গেল কেন? শনিবার কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী রামমোহন নাইডু বলেছেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছে এএআইবি। কিন্তু তদন্তের এখনও অনেক স্তর বাকি। আরও অনেক কিছু জানা যাবে। অতএব ধৈর্য ধরতে হবে।’ এয়ারলাইন্স পাইলট অ্যাসোসিয়েশন কিন্তু এই রিপোর্টে ক্ষুব্ধ। তাদের দাবি, পাইলটদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর ইঙ্গিত মিলছে। সেটা কি আসল ঘটনা ধামাচাপা দিতে? এটা মেনে নেওয়া হবে না।
ঠিক কী হয়েছিল অন্তিম মুহূর্তে? এয়ারক্র্যাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর রিপোর্ট বলছে, দিল্লি থেকে এই বিমান আমেদাবাদে ল্যান্ড করার পর ফ্লাইটকর্মীরা টেক লগে স্টেটাস রিপোর্ট জমা দেন। বিমান প্রস্তুত হয় পরবর্তী ফ্লাইট অর্থাৎ লন্ডনের গ্যাটউইকের জন্য। এয়ারপোর্ট ট্যাক্সি ক্লিয়ারেন্স সিগন্যাল পাওয়ার পর ৩৪ নং বে থেকে বেরিয়ে রানওয়ে ফোর পর্যন্ত পৌঁছে বিমান যখন টেক অফ ক্লিয়ারেন্স পেয়েছে, তখনও কোনও সমস্যা হয়নি। যা হয়েছে, তারপর। ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার থেকে জানা যাচ্ছে, ১টা ৩৯ মিনিট ৫ সেকেন্ডে পাইলট চিৎকার করে এটিসিকে জানিয়েছিলেন শেষ বাক্য, ‘মেডে... মেডে... মেডে..।’  তৎক্ষণাৎ কল সাইন ইস্যু করল এটিসি। কিন্তু ককপিট থেকে কোনও শব্দ এল না। ১টা ৪৪ মিনিটে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল দেখল, এয়ার ইন্ডিয়া ১৭১ ভেঙে পড়ছে। এই হল প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট। কিন্তু রহস্যের সমাধান হল না! কেন বন্ধ হল দুই ইঞ্জিনের সুইচ? একসঙ্গেই! 

সম্পর্কিত সংবাদ