ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শিকলে তখন ধীরে ধীরে বাঁধা পড়ছে ভারত। সেই পালাবদলের মুহূর্তটা ফুটে উঠেছিল বাংলার নদীয়ার এক বাসিন্দার লেখায়। ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ ছিল তাঁর। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহের আলমের কূটনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন তিনি। তিন বছর পর বাংলায় ফিরে আসেন । মুঘল বাদশার এই প্রতিনিধির নাম মির্জা শেখ ইতিসামুদ্দিন। পলাশীর যুদ্ধের পর ধীরে ইংরেজ বণিকদের মাণদণ্ড ক্রমেই রাজদণ্ড হয়ে ওঠে। ১৭৬৪ সালে বক্সার যুদ্ধে কোম্পানির কাছে হেরে যায় মুঘল বাদশাহ, অযোধ্যা ও বাংলার নবাবের সম্মিলিত বাহিনী। ভারতীয় শাসকদের দুর্বলতার জেরে ইংরেজের মুঠি আরও শক্ত হয়। এলাহাবাদে শান্তি চুক্তিতে বাংলার রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সেই সময় বিরোধী পক্ষের চাপের মুখে পড়ে ইংরেজ বাহিনীর কাছে নিরাপত্তার আর্জি জানান বাদশাহ শাহ আলম। কিন্তু এব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্লাইভের ছিল না। সেজন্য তিনি শাহ আলমকে ব্রিটিশরাজের কাছে উপঢৌকন সহ অনুরোধপত্র পাঠানোর পরামর্শ দেন। ঢাকার প্রথম ইংরেজ প্রশাসক ক্যাপ্টেন সুইন্টন এই দৌত্যর জন্য মনোনীত হন। তাঁকে সহযোগিতার জন্য নিযুক্ত করা হয় ফার্সি ভাষায় পণ্ডিত ইতিসামুদ্দিনকে। ১৭৬৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় জর্জের কাছে মুঘল সম্রাটের দৌত্যের কাজে বিলাত পাড়ি দেন তিনি। ইতিসামুদ্দিনের জন্ম নদীয়ায়। তাঁর পিতামহ একটি গ্রন্থের লেখক ছিলেন। মীর জাফরের আমলে মুন্সি সলিমুল্লাহ ও মুন্সি মির্জা কাসিমের কাছে ইতিসামুদ্দিন পড়াশোনা। এরপর ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর এক মেজরের অধীনে চাকরি নেন। ঘটনাপ্রবাহে মুঘল সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয় তাঁর। এই আলাপের সূত্র ধরে শাহি দরবারের মুন্সির পদে নিযুক্ত হন ইতেশামুদ্দিন। পাশাপাশি দেওয়া হয় মির্জা খেতাবও । কর্মজীবনের এই সাফল্যই তাঁকে পৌঁছে দেয় লন্ডনের পথে। রামমোহনের প্রায় ৬০ বছর আগে ইংল্যান্ডে পা রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু ধূর্ত ক্লাইভের চালে ব্যর্থ হয়েছিল ওই দৌত্য। বছর তিনেক পর বিলেত ছাড়েন তিনি। দেশে ‘বিলায়তি মুন্সি’ হিসেবে সমাদর পেয়েছিলেন তিনি। ১৭৮৪ সালে তিনি তার অভিজ্ঞতা ফার্সি ভাষায় লিপিবদ্ধ করেন। গ্রন্থের নাম- ‘শির্গাফে-নামা-এ বিলায়েত’।



