


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও বারাকপুর: বঙ্গ রাজনীতির ‘চাণক্য’ নামে পরিচিত বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মুকুল রায়ের জীবনাবসান। রবিবার গভীর রাতেকলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। দীর্ঘদিন ধরে কোমায় ছিলেন তিনি। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৬০০ দিন। হৃদরোগেআক্রান্ত হয়ে রবিবাররাত দেড়টা নাগাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুকুল রায়ের প্রয়াণে শোকজ্ঞাপন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন, ‘আমি শোকাহত। মুকুল রায়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সমাসজেবামূলক প্রচেষ্টা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর পরিবার ও সমর্থকদের প্রতি সমবেদনা জানাই। ওঁ শান্তি।’ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীকে হারিয়ে মর্মাহত তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুকুল রায়ের সঙ্গে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের স্মৃতিচারণা উঠে এসেছে মমতার কথায়। হাসপাতাল থেকে মুকুল রায়ের মরদেহ আসে বিধানসভায়। সেখানে থেকে কাঁচড়াপাড়ার বাড়ি হয়ে হালিশহর মহাশ্মাশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মুকুল পুত্র শুভ্রাংশু রায়কে আগলে রেখে আগাগোড়া হাজির ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজনীতির কারবারিরা বলে থাকেন, রাজ্যের ৮১ হাজার বুথে সাংগঠনিক যোগাযোগে নজির সৃষ্টি করেছিলেন মুকুল রায়। দলের কর্মী থেকে আমজনতার সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ রাখাই ছিল তাঁর প্রধান ভিত্তি। ১৯৯৮ সালে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে তিনি ছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। সেইসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত আস্থাভাজন। তবে মুকুলের রাজনীতিতে হাতেখড়ি বাম ছাত্র সংগঠনে এসএফআইতে। তারপর সোমেন মিত্রের হাত ধরে কংগ্রেসে। নব্বই দশকের গোড়া থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। এমনকি ১৯৯৭ সালে তৃণমূল দল গঠনে নথিপত্র জমা দেওয়ার পর্বে মুকুল ছিলেন মমতার অন্যতম সহকর্মী। ২০০৬ সালে রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন মুকুল। ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী ও ২০১২ সালে রেলমন্ত্রী হিসেবে গুরু দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১২ সালে দ্বিতীয়বার রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন মুকুল। ২০১৭ সালে বিজেপিতে যোগ দেন এবং ২০২১ সালে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্রের বিধায়ক নির্বাচিত হন। তবে ২০২১ সালের ১১ জুন ফের তৃণমূলে ফিরে আসেন তিনি।
এদিন ২টো ৪২ মিনিট নাগাদ মুকুলের মরদেহবিধানসভায় আনা হয়। সেখানে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান অভিষেক, বিধানসভার অধ্যক্ষ, রাজ্যের মন্ত্রী, তৃণমূল ও বিজেপি বিধায়করা। সামাজিক মাধ্যমে অভিষেক লিখেছেন, রাজ্যের জনজীবন ও রাজনৈতিক যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে মুকুল রায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা স্তম্ভ হিসেবে সংগঠনের বিস্তার ও সুসংহতকরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরে কাঁচড়াপাড়ার বাড়ি, দলীয় পার্টি অফিসে মুকুলের মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানান সাধারণ মানুষ। সেখান থেকে সাত কিলোমিটার পদযাত্রায় করে মুকুলের মরদেহ হালিশহর মহাশ্মাশানে নিয়ে যাওয়া হয়। রাস্তার দু’ধারে শয়ে শয়ে সাধারণ মানুষ মুকুল রায়কে শেষ দেখার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। শুভ্রাংশু রায় বলেন, ২০২১ সালে মা’কে হারিয়েছি। এবার বাবা’কে হারালাম। মাথার উপর থেকে ছাদ চলে গেল। বারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিক জানিয়েছেন, আগামী ৫ মার্চ বীজপুরে মুকুল রায়ের স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হবে।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুকুল রায়ের সহসা প্রয়াণের সংবাদে বিচলিত ও মর্মাহত বোধ করছি। তিনি আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন। বহু রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর বিদায়ের খবর আমাকে বেদনাহত করেছে। প্রয়াত মুকুল রায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দলের জন্য প্রাণপাত করেছেন। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন। দলের সর্বস্তরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। পরে তিনি ভিন্ন পথে যান। আবার ফিরেও আসেন। বাংলার রাজনীতিতে তাঁর অবদান এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কথা ভুলবার নয়। দলমত নির্বিশেষে তাঁর অভাব অনুভব করবে রাজনৈতিক মহল। এই অভিজ্ঞ নেতা ও সহকর্মীর পরিবার ও অনুরাগীদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাই। শুভ্রাংশুকে বলব, মন শক্ত করো, এই সংকটে আমরা তোমার সঙ্গে আছি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়