


অস্কারের ভুলেই হার ইস্ট বেঙ্গলের
সোমনাথ বসু, কলকাতা: ম্যাচ শেষ হতেই সংগ্রাম মুখার্জির ফোন। রিসিভ করার সঙ্গেসঙ্গে প্রাক্তন দুর্গপ্রহরী বলে উঠলেন, ‘এটা কী করল ইস্ট বেঙ্গল? গোটা ম্যাচ ভালো খেলা সত্ত্বেও গিলকে তুলে দেবজিৎকে নামানোর কোনও মানে হয় না। এই একটা ভুলেই পরপর দু’টি ডার্বি জেতা হল না অস্কার-ব্রিগেডের।’
একদম ঠিক কথা বলেছেন সংগ্রাম। দেবজিৎ ভালো গোলরক্ষক। তবে ছিলেন, এখন নন। তা সত্ত্বেও তাঁর উপর ভরসা কেন? গা সেভাবে গরম না করেই তিনি কোচের পরামর্শে ড্যাং ড্যাং করে মাঠে নেমে পড়লেন! এটা কি পাড়ার মাঠে খেলা? অস্কার এবং তাঁর জন্যই শনিবার যুবভারতীতে দৃষ্টিনন্দন ফুটবল না খেলেও শিল্ড জিতল মোহন বাগান। উল্লেখ্য, শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ দেখতে হাজির ছিলেন মেরেকেটে ৪০ হাজার অনুরাগী। মোহন বাগান সমর্থকদের না হয় মান-অভিমান ছিল। কিন্তু ইস্ট বেঙ্গল? লাল-হলুদ অনুরাগীরা তো পারতেন শব্দব্রহ্ম দিয়ে বিপক্ষকে নাড়িয়ে দিতে।
আসলে ক্লাব ফুটবলের মান ক্রমশ পড়ছে। অর্থের প্রাচুর্য দিয়ে ফুটবলারদের দক্ষতার আন্দাজ করা উচিত নয়। কোটি কোটি টাকার প্লেয়ারদের শনিবার চিনতে হয়েছে জার্সি নম্বর দেখে। বিরক্তিকর খেলা দেখতে দেখতে অনেকে তুলেছেন হাই, আবার কেউ বা নজর দিয়েছেন মুঠোফোনের স্ক্রিনে। মোহন বাগান কোচ হোসে মোলিনার হাতে ম্যাচ উইনার অনেক বেশি। ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে দল সাজান তিনি। কিন্তু তেমন আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলল কোথায় তাঁর দল! ম্যাচের অষ্টম মিনিটে একটি শট ছাড়া ম্যাকলারেনকে খুঁজেই পাওয়া গেল না। এরপর সাহালের বুদ্ধিদীপ্ত থ্রু বক্সের মধ্যে তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু আনোয়ার ট্রিপ করায় পেনাল্টি পায় মোহন বাগান। শট নিতে এগিয়ে আসেন আরেক অজি তারকা জেসন কামিংস। বড়লোকের বাউন্ডুলে ছেলের মতো তাঁর শট ক্রসবারের অনেকটা উপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। ম্যাচের বয়স তখন ৩২ মিনিট। বোঝাই গেল, সমর্থকদের বিক্ষোভ কামিংসের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে। এর তিন মিনিট পরেই লিড নেয় ইস্ট বেঙ্গল। রশিদের পাস ধরে আক্রমণটি তৈরি করেন মহেশ। বাঁ প্রান্তে প্রায় কুড়ি গজ দৌড়ে তাঁর মাইনাস তৎপরতার সঙ্গে গোলে পাঠান হামিদ (১-০)। এরপর মরক্কান স্ট্রাইকারটি দু’টি সহজ সুযোগ নষ্ট না করলে ম্যাচের ফল অন্যরকম হতেই পারত। ৪০ মিনিটে তাঁর শট অবশ্য পোস্টে ধাক্কা খায়। প্রথমার্ধের সংযোজিত সময়ে সমতায় ফেরে মোহন বাগান। ডানপ্রান্ত থেকে সাহালের মাইনাস লিস্টন হয়ে চলে আসে আপুইয়ার কাছে। তাঁর জোরালো শট ক্রসবারে লেগে গোললাইন অতিক্রম করে (১-১)।
দ্বিতীয়ার্ধেও খেলার গতি-প্রকৃতিতে তেমন বদল আসেনি। এই পর্বে জয় গুপ্তা, হিরোশি ও মিগুয়েলকে নামিয়ে মাঝমাঠ দখলে নেওয়ার চেষ্টায় ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল কোচ অস্কার। পক্ষান্তরে, নিষ্প্রভ কামিংসকে তুলে রবসনকে ব্যবহার করেন মোলিনা। আসলে সেন্ট্রাল মিডফিল্ড পরিচালনা করার মতো ফুটবলার দুই দলেই নেই। তারই প্রভাব পড়ল ম্যাচে। নির্ধারিত সময়ের শেষদিকে ইস্ট বেঙ্গলের রশিদের শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর রবসনের ফ্রি-কিক থেকে নেওয়া মেহতাব সিংয়ের দুরন্ত হেড ততোধিক দক্ষতায় রুখে দেন প্রভসুখন গিল। অতিরিক্ত সময়েও খেলা আহামরি কিছু হয়নি। ম্যাকলারেনের পরিবর্তে পেত্রাতোস নামার সময় মোহন বাগান গ্যালারি থেকে হাল্কা উচ্ছ্বাসের শব্দ ভেসে আসে।
টাই-ব্রেকারের ঠিক আগে অহেতুক গিলের জায়গায় দেবজিৎ মজমুদারকে নামানো হয়। এই পর্বে মোহন বাগানের হয়ে জাল কাঁপান যথাক্রমে রবসন, মনবীর, লিস্টন, পেত্রাতোস ও মেহতাব সিং। উল্টোদিকে ইস্ট বেঙ্গলের মিগুয়েল, সিবলে, মহেশ ও হিরোশি লক্ষ্যভেদে সফল হলেও জয় গুপ্তার শট ডানদিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন বিশাল কাইথ। সেই মুহূর্তেই কার্যত ২১তম শিল্ড খেতাব নিশ্চিত হয় মোহন বাগানের।
মোহন বাগান: বিশাল, মেহতাব, আলবার্তো, আলড্রেড, শুভাশিস, সাহাল (মনবীর), অনিরুদ্ধ থাপা (দীপক), আপুইয়া, লিস্টন, কামিংস (রবসন) ও ম্যাকলারেন (পেত্রাতোস)।
ইস্ট বেঙ্গল: গিল (দেবজিৎ), রাকিপ, আনোয়ার, সিবলে, লালচুংনুঙ্গা (জয় গুপ্তা), এডমুন্ড (বিষ্ণু), রশিদ,সাউল (মিগুয়েল), মহেশ, বিপিন (শৌভিক) ও হামিদ (হিরোশি)।
মোহন বাগান-১ (আপুইয়া) : ইস্ট বেঙ্গল-১ (হামিদ)
টাই-ব্রেকারে ৫-৪ ব্যবধানে জয়ী মোহন বাগান