বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ‘জুমলা’ শব্দটির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে মোদি সরকার। কিন্তু স্বচ্ছতা? এই ইস্যুতেও এবার কাঠগড়ায় গেরুয়া বাহিনী! নরেন্দ্র মোদির মঞ্চ কাঁপানো স্লোগান, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা।’ অথচ, এবার খোদ আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের রিপোর্ট স্পষ্ট করে দিল দাবি আর বাস্তবের মাঝে বিস্তর ফারাকটা। আম আদমির করের টাকায় রাজকোষ ভরে কেন্দ্রের। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলে রাজস্ব। সেই টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে, তা জানার অধিকারও রয়েছে আম আদমির। কিন্তু এই খরচেই বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে গিয়েছে। আর্থিক স্বচ্ছতার নিরিখে বিশ্বের ১২৫টি দেশকে নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড বা আইএমএফ একটি তালিকা তৈরি করে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ইউপিএ জমানার তুলনায় ৪০ ধাপ নেমে গিয়েছে মোদির ভারত। ২০১২ সালে যেখানে এই তালিকায় ভারত ১৪ নম্বরে ছিল, সেখানে ২০২৩ সালে সেই র্যাঙ্কিং পৌঁছেছে ৫৪ নম্বরে।
রাজ্যগুলিতে করের টাকা কীভাবে বণ্টন হবে, তা ঠিক করতে প্রতি পাঁচ বছরে অর্থ কমিশন গঠন করে কেন্দ্র। ১৬তম কমিশন ইতিমধ্যেই গঠিত হয়েছে, কাজও শুরু করে দিয়েছে। তারই প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতির স্বচ্ছতার প্রশ্নে একটি রিপোর্ট পেশ করেছে অর্থমন্ত্রকের অধীনে থাকা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি। তাদের কথায়, কোনও দেশের আর্থিক নীতি নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যতটা তথ্য তুলে ধরা হয়, সেটাই খরচের স্বচ্ছতা বা আর্থিক স্বচ্ছতা। এই বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া শুরু ১৯৯৮ সালে। কারণ, ১৯৯৭ সালে এশিয়াজুড়ে আর্থিক মন্দার পর থেকেই আইএমএফের সঙ্গে এই বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয় ভারত। রিজার্ভ ব্যাঙ্কও বলে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আর্থিক স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই। অর্থমন্ত্রকের অধীনস্থ সংস্থাটিই রিপোর্টে বলেছে, সরকারের নিজেদের মধ্যেই যে অর্থের আদানপ্রদান হয়, স্বচ্ছতার প্রশ্নে তা অত্যন্ত উদ্বেগের। অর্থ কমিশন গড়া হলেও, যে কৌশল বা ফর্মুলার নিরিখে বিভিন্ন মন্ত্রক ও রাজ্যগুলিকে কর বা রাজস্ব বণ্টন করা হয়, তাতেও ভরপুর অস্বচ্ছতা। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগের যে, ১৬তম অর্থ কমিশন প্রস্তাব দিয়েছে, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে একটি পোর্টাল তৈরি করা হোক। সেখানে সব তথ্য আপলোড করা হবে। তা আদৌ হবে কি না, তা অবশ্য ভবিষ্যৎ বলবে। রিপোর্টটি বলছে, সরকারের বেশ কিছু ‘গোপন ঋণ’ রয়েছে বা চুপিসারে ঋণ নেওয়া হয়, যা প্রকাশ্যে আসে না। তারই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে আইএমএফের তালিকায়। এই রিপোর্ট প্রতি দু’বছরে একবার বের করে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। ২০২১ সালে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে এই তালিকাতেই কিন্তু ভারতের স্থান ছিল ৭৮!
রিপোর্টে বলা হয়েছে, কোথায় কত আর্থিক অসঙ্গতি রয়ে গেল, তার বিবেচনায় ক্যাগকেই শুধুমাত্র ভরসা করলে চলবে না। দরকার ফিসক্যাল কাউন্সিলের মতো একটি স্বশাসিত সংস্থা তৈরি করা, যা স্বাধীনভাবে দেশের আর্থিক অবস্থার পর্যালোচনা করবে এবং আগামী দিনে আর্থিক পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে, তার পূর্বাভাসও দিতে পারবে। তাতে যেমন বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়বে, তেমনই তার গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।