চারণ কবি মুকুন্দ দাস। পালা, গানে বাঙালি জাতির বুকে দেশাত্মবোধের আগুন জ্বালিয়েছিলেন বরিশালের ‘যজ্ঞেশ্বর’। মুকুন্দের পৈতৃক নাম। যৌবন শুরু পারিবারিক মুদির দোকানে বসে। কিন্তু, বেশিদিন ওই চার দেওয়ালে বন্দি রইলেন না। সেইময় হরিভক্তিতে বরিশালকে মাতাচ্ছেন কীর্তনশিল্পী বীরেশ্বর গুপ্ত। তাঁর দলে যোগ দিলেন যজ্ঞেশ্বর। পৈতৃক মুদির দোকানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল চারণ কবির কীর্তন দল। ভক্তিরস-কালী সাধনায় মগ্ন মুকুন্দের মনে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রের প্রাথমিক পাঠ দিয়েছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্ত। বলেছিলেন, ‘যজ্ঞা, তোকে দেশের এই সঙ্কটে নিতে হবে চারণের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা।’ সেই সময় বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বাংলার আনাচে কানাচে আছড়ে পড়েছে স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার। বাদ যায়নি বহু বিপ্লবীর আঁতুড়ঘর বরিশালও। তাতে অংশ নিলেন তরুণ মুকুন্দও। গান, কবিতা লিখে বাঙালির জাতীয়তাবাদে নয়া উদ্দীপনা যোগ করলেন। তাঁর কলম থেকে বেরল কালজয়ী পালা ‘মাতৃপূজা’। পালা তো তৈরি, কিন্তু ব্রিটিশের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে অভিনয় করবে কে? পোশাক আসবে কোথা থেকে? টাকা কই? এমনই অনেক প্রতিকূলতাকে হারিয়ে দুর্গাপুজোর সপ্তমীতে বরিশালেরই বাশরিপাড়ার নবগ্রামে ভোলানাথ গুহঠাকুরতার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথমবার মঞ্চস্থ হল ‘মাতৃপূজা’। দ্রুত তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল। মুকুন্দ গেয়ে উঠলেন, ‘ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে/ মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে/ তাথৈ তাথৈ থৈ দ্রিমী দ্রিমী দং দং/ভূত পিশাচ নাচে যোগিনী সঙ্গে।’ তাতেই ঘুম উড়ল ব্রিটিশ প্রশাসনের। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলার অভিযোগে এই পালা রচনা ও নাট্য রূপায়ণের জন্য মুকুন্দ দাসকে গ্রেপ্তার করল পুলিস। তিন বছর জেল হল চারণ কবির। স্থানান্তরিত করা হল দিল্লি জেলে। কারাবাস শেষ করে ফিরলেন বঙ্গে। চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসুর অনুপ্রেরণায় ফের দল গড়তে, পালা লিখতে উদ্যোগী হলেন মুকুন্দ। তবে ব্রিটিশের চোখে ‘ডেসপারেট ক্যারেক্টার’ হওয়ায় তার প্রতি কড়া নজর ছিল প্রশাসনে। তবে উর্দিধারীদের লাল চোখকে তোয়াক্কা করেননি মুকুন্দ। মঞ্চস্থ করলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘বলিদান’ অবলম্বনে ‘সমাজ’, হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘দাদাঠাকুর’ অবলম্বনে ‘আদর্শ’। এ ছাড়াও রয়েছে ‘ব্রহ্মচারিণী’, ‘পল্লীসেবা’, ‘কর্মক্ষেত্র’, ‘পথ’। ২২ ফেব্রুয়ারি ছিল কবির জন্মদিন।



