আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে
  • ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

জিষ্ণু বসু: দেবীপক্ষের চতুর্থীর দিন হলদিয়া শহর এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালের নতুন প্রকল্প ‘এডপারমা’র উদ্বোধন করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সঙ্গে ছিলেন প্রায় সম্পূর্ণ মন্ত্রিসভা আর আধিকারিকরা। বাঙালি এক  শিল্পপতি ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেন ভারতের সর্ববৃহৎ  সমন্বিত প্রোপেন আর এসিটোন উৎপাদন কারখানায়। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালে সঙ্গে আমেরিকার লুম্মাস টেকনোলজিস প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় তৈরি  হল এডপারমা। বার্ষিক ৩৪৫ কিলোটন ফেনল আর ২১৫ কিলোটন এসিটোন উৎপাদন করতে পারবে এই কারখানা। প্লাইউড থেকে পলিকার্বোনেট, গাড়ির যন্ত্রাংশ থেকে   শিল্পে ব্যবহার্য তন্তু সবক্ষেত্রেই আজ প্রয়োজন ফেনল। আবার রং থেকে আঠা কিংবা এক্রেলিক থেকে ইমারতি উপাদান সর্বত্র প্রয়োজন এসিটোন।

Advertisement

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ফেনল আমদানিকারক দেশ ভারত। তাই পশ্চিমবঙ্গের  এই পদক্ষেপ আত্মনির্ভর ভারতবর্ষের পথে একটি ধাপ। পূর্ব মেদিনীপুরের হরিপুরেই রিলায়েন্স ইন্ড্রাস্ট্রিজ রাজ্যের প্রথম  পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি স্থাপন করতে চলেছে। ২ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ হবে এই ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে। এই চ্যাটার্জি গ্রুপ এবং রিলায়েন্স উভয়ই পশ্চিমবঙ্গে ডেটা সেন্টার গড়তে আগ্রহী। আইটিসি’ও তাদের পরিকল্পনা রেখেছে। যেকোনো শিল্পে ‘প্রফিট পুল’ নিজের দিকে রাখতে তথ্যপ্রযুক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ আর দেশীয় ডেটা সেন্টার তৈরি জরুরি।  দীঘায় রাজ্যের প্রথম সাবমেরিন কেবল আসতে চলেছে। এরাজ্যে তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এগুলি অবশ্যই বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
পূর্ব মেদিনীপুরে গভীর সমুদ্র বন্দর আর কলকাতা-হলদিয়া বন্দর, বলাগড় জাহাজ নির্মাণের জন্য ১৯,২০৯ কোটি টাকার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কলকাতা ডকের পরিকাঠামো নির্মাণে ইতিমধ্যে জেএসডব্লু ইনফ্রাট্রাকচার ৮৩২ কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে। মেজিয়ায় শ্যাম স্টিল ১৫ হাজার কোটি টাকার ইস্পাত কারখানার কাজ শুরু করেছে, যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা শুরু হয়েছে খড়্গপুরেও। এতে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের হাতে কাজ আসবে। রঘুনাথপুরে জুপিটার ডিফেন্স প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন কেন্দ্র গড়ছে। এখানে নিয়োগ সম্ভাবনা বিপুল।
চিংড়িঘাটা-সুকান্তনগর ৩৬৬ মিটার মেট্রোরেল লাইনের ব্যাবধান অবশেষে জুড়ে গিয়েছে। নিউ গড়িয়া থেকে সেক্টর ফাইভ অরেঞ্জ লাইনের ট্রায়াল রান শুরু হয়েছে মহালয়াতে। আইটিসি প্রায় ২৩০০ কোটি টাকায় কাগজ, পেপার বোর্ড, সৌরবিদ্যুৎ, হোটেল আর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসার সম্প্রসারণ করছে। ফলতায় হচ্ছে সৌরকোষ তৈরির কারখানা। পুরুলিয়া,  বালুরঘাট, মালদহ, কলাইকুন্ডা প্রভৃতি স্থানে ছোটো বিমানবন্দর হচ্ছে।
আজকের পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের সাতকাহনের বেশিরভাগটাই এখনো না-বলা রয়ে গেল। বৈচিত্রও লক্ষণীয়। মেজিয়ায় যেমন ইস্পাত কারখানা এসেছে, ডানকুনিতে পোশাক উৎপাদন, হাওড়ায় দুগ্ধশিল্প, রায়চক আর ইছাপুরে প্রতিরক্ষা ও জাহাজ নির্মাণ শিল্প গড়ে উঠছে। এছাড়া নিউ টাউনে হাসপাতাল ও তথ্যপ্রযুক্তি, ফলতায় সৌরশক্তি, রঘুনাথপুরে প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং দুর্গাপুর-পানাগড়ে সম্ভাব্য সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। এটা শিল্পোন্নয়নের মোটামুটি চালচিত্র। 
এই লেখা শুরু হয়েছিল পূর্ব মেদিনীপুর থেকে। অতঃপর সারা রাজ্যই ঘুরে দেখা গেল। শিল্পের বিস্তার ঘটছে রাজ্যজুড়েই।  আজ যেমন কিছু মানুষ আক্ষেপ করছেন, ছাত্র বিক্ষোভের নামে ককরোচ জনতা পার্টিকে কেন কলকাতায় অরাজকতা ছড়াতে দেওয়া হচ্ছে না! তেমন পশ্চিমবঙ্গে গ্রাম থেকে শহর—মানুষ বুক বাঁধছেন একটাই আশায়, তাঁদের সন্তান যেন দুধে ভাতে বেঁচে থাকে। প্রতি হাতে কাজ আর প্রতি ঘরে ভাত, এইটুকু বহুদিন পায়নি এই রাজ্য। এবার কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গ।
(লেখক: সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের প্রযুক্তিবিদ)