রাত বেশ গভীর। বাইরে ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ। আবছা আলোয় খেতে বসেছেন নেত্র সেন। হঠাৎই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। পাশে বসা স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন। কে এল এত রাতে? কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব অন্ধকার। রামদার এক কোপে ধড় থেকে মাথাটা আলাদা হয়ে গেল। বিশ্বাসঘাতকের তো শাস্তি এটাই! ব্রিটিশদের ১০ হাজার টাকার লোভে সূর্য সেনের গোপন আস্তানার খোঁজ পুলিসকে দিয়েছিলেন নেত্র সেন। তাঁর স্ত্রীও একথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। কোনওদিন পুলিসের কাছে মুখ খোলেননি কে বা কারা, তাঁর স্বামীকে মারল। সময়টা গত শতাব্দীর তিনের দশক। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, ক্যাপ্টেন ক্যামেরনকে হত্যার ঘটনায় পুলিসের কাছে মোস্ট ওয়ান্টেড মাস্টারদা সূর্য সেন। সরকার ঘোষণা করল, সূর্য সেনকে ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। ওই বিজ্ঞপ্তি জারি হতেই চারপাশে হইচই পড়ে যায়। কিন্তু কোনও ফর্মুলাতেই অঙ্কের মাস্টারমশাইকে প্যাঁচে ফেলা যাচ্ছিল না। স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো মাস্টারদাকে আগলে রাখছিলেন সকলে। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে আত্মগোপন করছিলেন বহু লোকগাথার নায়ক। ১৯৩৩ সালে বিপ্লবী ব্রজেন সেন গৈরালা গ্রামে নিয়ে এলেন মাস্টারদাকে। তিনি আশ্রয় নিলেন ওই গ্রামেরই বিশ্বাসবাড়ির বউ ক্ষীরোদাপ্রভা দেবীর কাছে। ব্রজেনবাবুর পরামর্শমতো সবটা চলতে লাগল। অত্যন্ত গোপনে। কিন্তু, ক্ষীরোদাপ্রভা ও ব্রজেনের ঘন ঘন কথাবার্তা দেখে সন্দেহ হয় ব্রজেনের দাদা নেত্র সেনের। কয়েকদিন পর্যবেক্ষণ করেন বিষয়টি। খোঁজ পান মাস্টারদার গোপন আস্তানার! আনন্দ আর ধরে না নেত্রর। মদ-জুয়ায় খুইয়েছেন অনেক কিছুই। এমন একজনের পক্ষে সরকারি টাকার টোপ গেলা অস্বাভাবিক নয়। বাড়ি থেকে গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে খবর দিয়ে এলেন পুলিসকে। তারপরই হানা ব্রিটিশ কর্তার। বেশ কয়েকজন বিপ্লবী বুক দিয়ে মাস্টারদাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু, লাভ হয়নি। ধরা পড়ে গিয়েছিলেন সূর্য সেন। তবে পুরস্কারের টাকা হাতে পাননি নেত্র। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি হিসেবে তার ধড় থেকে মাথাটাই আলাদা করে দিয়েছিলেন মাস্টারদার অনুগামীরা। ২২ মার্চ ছিল বিপ্লবী সূর্য সেনের জন্মদিন।



