বাংলার একান্ত নিজস্ব নৃত্যশিল্প—ছৌ। গ্রাম-বাংলার আদি সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন। চিত্তাকর্ষক, মৌলিক শিল্পকাজ সমৃদ্ধ রঙিন মুখোশ ও পোশাক এই শিল্পের উপকরণ। রামায়ণ ও মহাভারতের মতো বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও লোককথার নানা চরিত্র অবলম্বনে এই মুখোশগুলি তৈরি হয়। সেগুলি মুখে এঁটে ছৌ শিল্পীরা তাঁদের নৃত্যে ফুটিয়ে তোলেন নানান কাহিনি। কোথায় মেলে এমন মুখোশ? এর আতুঁড়ঘর ‘মুখোশ গ্রাম’। আসলে এই গ্রামের নাম চড়িদা। কিন্তু ছৌ শিল্পের হাত ধরেই পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডি ব্লকের এই গ্রামের নামটা বদলে গিয়েছে। কারণ এখানেই থাকেন মুখোশ তৈরির অধিকাংশ কারিগর। গ্রামের দু’পাশে সার দিয়ে দোকান। বাইরে ঝুলছে দেবী দুর্গা, কালী বা গৌতম বুদ্ধের মুখ। কোথাও আবার অসুর, রাক্ষস বা নারী-পুরুষের মুখাবয়ব। কারিগরদের অনেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত। যেমন কান্তি সূত্রধর। পাঁচ পুরুষ ধরে তাঁরা ছৌ-শিল্পীদের মুখোশ বানিয়ে চলেছেন। শৈশব থেকে বাড়ির ছেলেমেয়ের মুখোশ তৈরি কারিগরিতে হাতেখড়ি হয়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে চলে দক্ষতা অর্জনের পালা। সবশেষে তুলির টানে পূর্ণতা পায় মুখোশ। এই গ্রামের প্রায় সকলেই মুখোশ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। পুরুলিয়াজুড়ে রয়েছেন ছৌ-শিল্পীরা। পর্যটকদের বিনোদনের জন্য প্রায়ই রিসর্ট বা কটেজগুলিতে ছৌ-শিল্পীদের ডাক পড়ে। এছাড়া বছরের নানা সময় দেশের নানা প্রান্তে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য পাড়ি দেন শিল্পীরা। আর সেই নাচের জন্য অভিনব সব মুখোশ গড়ার বরাত আসে চড়িদা গ্রামে। কান্তিবাবু জানালেন, মুখোশের মৌলিকতা ধরে রেখেছেন চড়িদার কারিগররাই। এখন অনেকে অন্যত্রও ছৌ-শিল্পের মুখোশ বানাচ্ছেন। কিন্তু তাতে প্রাচীনত্বের ছোঁয়া, রঙের অভিনবত্ব ও ঐতিহ্যের রূপ সেভাবে ফুটে ওঠে না। কারণ, এই শিল্পের কারিগরির আসল চাবিকাঠি রয়েছে চরিদার হাতেই। এখন দেশের সীমা পেরিয়ে বিদেশেও ছৌ-নৃত্য পরিবেশিত হয়। তবে সব কাজের বরাত অবশ্য চরিদায় আসে না। প্রযুক্তির কল্যাণে মুখোশ শিল্পের নকলও হচ্ছে। তবে এখনও এই গ্রামের শিল্পীদের কদরই সবচেয়ে বেশি। পুরুলিয়া ও সংলগ্ন এলাকা থেকে পাওয়া বরাতেই খুশি এখানকার শিল্পীরা।



