সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: স্বামীর নাম আছে, স্ত্রীর নাম নেই। পদবী আছে, সঠিক নেই! বাপের বাড়িতে এক পদবী। স্বামীর ঘরে আর এক। অতঃপর, নির্বাচন কমিশনের কাছে ‘সন্দেহভাজন’। নাম ওঠেনি খসড়া তালিকায়। শুনানির নোটিশ পেয়ে চরম উৎকণ্ঠায় বর্ধমানের এমন একাধিক বধূ। সেই সঙ্গে উপরি পাওনা টিপ্পনি আর বিদ্রুপ। কখনও পরিবারের ভালোবাসার লোকেরা নানা কথা শোনাচ্ছে। আবার কখনও পড়শিরা নানা মন্তব্য করছেন। সবারই ব্যাঙ্গাত্মক আবদার—‘ওপারে গিয়ে বড় সাইজের ইলিশ পাঠাইবা। এখানে বইসা আমরা খাইবে সুখে।’ এরকম টিপ্পনি শুনতে শুনতে নোটিশ প্রাপক বধূরা ক্লান্ত। মনের ভিতর জমছে চাপা ক্ষোভও। বছরের শেষের উৎসব সবার কাছেই ম্লান। এমন কী, নাওয়া-খাওয়াও ভুলেছেন কেউ কেউ। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে কোনও কোনও পরিবারে। কখনও কখনও তা আছড়ে পড়ছে রাজনৈতিক দলের এসআইআর সংক্রান্ত শিবিরে। সবমিলিয়ে, বাংলায় নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া পারিবারিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে বলে অভিযোগ উঠছে।
বর্ধমানের বাসিন্দা কবিতা ঘোষ। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল। কিন্তু, বিএলও অ্যাপসে নেই। তাঁকে নোটিশ ধরিয়েছে কমিশন। রবিবার কার্জনগেটের কাছে তৃণমূলের ক্যাম্পে হন্তদন্ত হয়ে এসে তিনি বলছিলেন, ‘আর পেরে উঠছি না। সবাই টিপ্পনি কাটছেন। বিদ্রুপ করছেন। মুখের উপর বলছেন আমাকে বাংলাদেশে চলে যেতে হবে। সেখান থেকে ইলিশ মাছ পাঠাতে বলছেন। স্বামী নাম খসড়া তালিকায় আছে। আমিও সেই ২০০২ সাল থেকে ভোট দিয়ে আসছি। অথচ, আমার নামটাই নেই। কিছু ভালো লাগছে না। বাড়িতে রান্না করতেও ইচ্ছে করছে না।’
এদিন আরও এক কবিতা ঘোষও এসেছিলেন তৃণমূলের ক্যাম্পে। তিনি বলেন, ‘শুনানি কেন্দ্রে কি হবে, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছি। তারউপর নানা ধরণের কটূক্তি সহ্য করতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার বাংলাদেশি বলে এখন থেকে তোপ দাগতে শুরু করেছেন। অথচ, আমাদের পূর্বপুরুষরা কেউই একবারের জন্যও বাংলাদেশে যাননি।’ কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় হার্ডকপিতে নাম থাকার পরও তা বিএলও অ্যাপসে দেখায়নি। সেই সমস্ত ভোটারদেরও সন্দেহজনক হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সবাইকে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। একই কারণে নোটিশ পেয়েছে খণ্ডঘোষের বিধায়কের মা, ভাই এবং ভাইয়ের স্ত্রী। বহু মহিলা এধরনের নোটিশ বেশি পেয়েছেন। এখন কি করবেন, তা নিয়ে সবাই বেশ আতঙ্কে। নীলপুরের এক বাসিন্দা বলছিলেন, ‘স্ত্রী জন্ম ১৯৯০ সালে। ২০০২ সালের আগে ওর বাবা, মারা গিয়েছেন। ওর নামে জমি বা অন্য কোনও সরকারি নথি নেই।
অথচ ওরা বংশপরম্পরায় কলকাতার গড়িয়ার বাসিন্দা। অথচ, নোটিশ ধরানো হয়েছে স্ত্রীকে। ভোটার তালিকায় যাতে ওর নাম থাকে, তারজন্য বিভিন্ন অফিসে দৌড়ঝাঁপ করছি। কোথাও কোনও সুরাহা মিলছে না। পরিবার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। খুব চিন্তায় পড়েছি।’ প্রতীকী চিত্র