যে ক’টি ধারা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যকে পুষ্ট করেছে, মঙ্গলকাব্য সেগুলির মধ্যে অন্যতম। আর মনসামঙ্গল হল সবক’টি মঙ্গলকাব্যের মধ্যে প্রাচীন। চতুর্দশ থেকে অষ্টদশ শতক পর্যন্ত অসংখ্য কবি মনসামঙ্গলের আখ্যান রচনা করেছেন। বহু পুঁথি আজও আবিষ্কৃত হয়নি। বহু ক্ষেত্রে মিলেছে পুঁথির খণ্ডিত অংশ। কোনও ক্ষেত্রে আবার কবির নামটুকুই শুধু জানা গিয়েছে। তাঁর রচিত কোনও পদ পাওয়া যায়নি। মনসামঙ্গলের পদ যাঁরা গাইতেন, সেই গায়েনরা কোনও নির্দিষ্ট পুঁথি অনুসরণ করতেন না। সাধারণত তাঁরা যে অঞ্চলে গান গাইতেন, সেই এলাকার বিভিন্ন কবির রচনা থেকে নিজেদের মতো করে একটি সংকলন করে নিতেন। সেখানে স্থান পেত স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নানা বৈশিষ্ট্য। ওই এলাকায় যে কবির যে নির্দিষ্ট পদ জনপ্রিয় ছিল বা উৎকৃষ্ট পদগুলি এক জায়গায় এনে পরিবেশন হতো। এভাবেই বহু কবির পদ সঙ্কলন করে একটি পুঁথি তৈরির চল মঙ্গলকাব্যের যুগের শুরু থেকেই চলে আসছে। আধুনিক সময়ে মনসামঙ্গলের পাঠ ও গবেষণাকে সুষ্ঠু ও সংগঠিত করার প্রয়োজনে আরও একবার মনসামঙ্গলের কবিদের পদ সঙ্কলনের উদ্যোগ নেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য। তাঁর সম্পাদনায় ১৯৫৪ সালে ‘বাইশ কবির মনসা-মঙ্গল বা বাইশা’ নামে গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই সংকলনের বিশেষত্ব হল, মধ্যযুগে মূলত গায়েনদের মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক ‘বাইশা’ সংকলিত হতো। রাঢ় অঞ্চলের ‘বাইশা’য় কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের পদের আধিক্য ছিল। একইভাবে বরিশাল অঞ্চলে বিজয় গুপ্ত, ময়মনসিংহে নারায়ণ দেব, শ্রীহট্টে ষষ্ঠীবরের রচনা প্রাধান্য পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সব সময় মনসামঙ্গলের কাহিনি বা আখ্যানের ঘটনাগত পারম্পর্য রক্ষিত হতো না। আশুতোষবাবু সেই দুরূহ কাজটি করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত গ্রন্থটিতে। এক মলাটের মধ্যে স্থান পেলেন হরি দত্ত, বিজয় গুপ্ত, নারায়ণ দেব, দ্বিজ বংশীদাস, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ, জগজ্জীবন ঘোষাল, ষষ্ঠীবর দত্ত, জীবন মৈত্র, বিষ্ণুপাল, বিপ্রদাস পিপলাই সহ ২২ জন কবি ও আখ্যানকারের রচনা। তবে মধ্যযুগে পদ সঙ্কলনের এই রীতি শুধু যে মনসামঙ্গলের ক্ষেত্রেই প্রচলিত ছিল, তা নয়। অন্যান্য পাঁচালী গানেও একই রীতি ছিল। কিন্তু সেগুলির কোনওটিকেই ‘বাইশা’ বা ‘বাইশ কবির মনসামঙ্গল’ বলা হতো না।



