সংবাদদাতা, রামপুরহাট: ভোটে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক ভাঙনে দিশাহারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবার। রামপুরহাট ১ ব্লকের সদ্য প্রাক্তন ব্লক সভাপতি তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মামাতো ভাই নীহার মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর বউমা, পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন সভাপতি পম্পা মুখোপাধ্যায় চরম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে তাঁরা নীরব। জেলার রাজনৈতিক মহলে যা নিয়ে চলছে চর্চা।
রামপুরহাটের কুসুম্বা গ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামার বাড়ি। ছোটবেলার অনেকটা সময় তিনি এখানেই কাটিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও বীরভূম সফরে এলে প্রায়ই মামার বাড়িতে আসতেন। ‘নবজোয়ার’ কর্মসূচিতে বীরভূমে এসে আচমকাই কুসুম্বা গ্রামে দাদুর বাড়িতে এসেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। মামিমা তাপসী মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর সময় ব্যস্ততার কারণে অভিষেক আসতে না পারলেও, তাঁর স্ত্রী রুজিরা বন্দ্যোপাধ্যায়, মা লতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাবা অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় কুসুম্বায় এসেছিলেন। স্বভাবতই, রামপুরহাটের এই প্রভাবশালী পরিবারের রাজনৈতিক নীরবতা স্থানীয়দের কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে।
২০১৮ সালে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের প্রতীকে কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে জেলা পরিষদের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন নীহারবাবু। তাঁর স্ত্রী পম্পা মুখোপাধ্যায় রামপুরহাট ১ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হয়েছিলেন। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে সমিতির আসনে পম্পাদেবী পরাজিত হলেও দলের সুপারিশে তাঁকে কৃষি বিষয়ক ‘আত্মা’ প্রকল্পের ব্লকের চেয়ারম্যান করা হয়। আর বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতির জেরে সব কমিটি ভেঙে দেওয়ার আগে পর্যন্ত ব্লক সভাপতি ছিলেন নীহারবাবু।
তৃণমূলের জেলাস্তরের শীর্ষ নেতা, বিধায়ক ও সাংসদদের একটা বড় অংশ যখন ‘কালীঘাট’ ছেড়ে ‘নতুন তৃণমূল’ বা অন্য রাজনৈতিক সমীকরণে গা ভাসাচ্ছেন, তখন কুসুম্বার এই প্রভাবশালী পরিবারটি পুরোপুরি ‘চুপ’।
এই বিষয়ে নিজের অসহায়তা প্রকাশ করে নীহার মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘কোনদিকে যাব সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। তৃণমূলেরই যদি একাধিক দল হয়, তাহলে রাজনীতি করে কী হবে? এসব আর ভালো লাগছে না। দিদির (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) অত্যন্ত কাছের ছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিও দিদিকে ছেড়ে দিয়েছেন। আমিও চাই না আশিসবাবুর সঙ্গে আমাদের মন কষাকষি হোক। পুরো দিশাহীন অবস্থায় রয়েছি।’ অন্যদিকে বাড়ির বউ পম্পা মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘দিদিকে দেখেই দল করা। আমি বাড়ির বউ, বাড়ির সবাই এই দলে ছিল, তাই তাঁদের সঙ্গেই থাকা উচিত। তবে এখন আমরা ‘আসল’ বা ‘খারাপ’ কোনো তৃণমূলের দিকেই নেই। চুপচাপ আছি।’
এই পরিস্থিতিতে সুর চড়িয়েছে বিরোধী শিবির। বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক শান্তনু মণ্ডল বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মীয়রা রাজনীতিতে এসেছিল ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাড়ানোর স্বার্থে। এখন তীব্র জনরোষের কারণে তাঁরা রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে পারছেন না। তাঁরা হয়তো ভাবছেন, বিজেপিতে এলে বাঁচতে পারবেন। কিন্তু যারা সরকারি অর্থ লুট করেছে, মানুষকে শোষণ করেছে, তাঁদের বাঁচানোর পক্ষে বিজেপি নেই। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ হবেই।’
তবে চতুর্দিকে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে যেভাবে মানুষ ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে, সেই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার চেয়েও নিজেদের সুরক্ষিত রাখাই নীহার ও পম্পাদের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।