প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্রাম: অরণ্য সুন্দরী তখনও শহর হয়ে ওঠেনি। শাল জঙ্গল ঘেরা ঝাড়গ্রামে সামান্য কিছু পরিবারের বসবাস। বাছুরডোবা এলাকায় বাইরে থেকে এসে কেউ কেউ ঘর বাঁধছেন। ঝাড়গ্রামের সব ঘরে তখনও রেডিও পোঁছায়নি। কিন্তু, যন্ত্রের মাধ্যমে কথা শোনার গল্পটা ততদিনে প্রান্তিক মানুষ জেনে গিয়েছেন। সময়টা ১৯৩৭ সাল। প্রথমবারের জন্য মহালয়ার ভোরে রাজবাড়ির রেডিওতে শোনা যাবে চন্ডীপাঠ। স্থানীয় বাসিন্দারা খবর পেয়ে ভোর ৪টে বাজাতেই চন্ডীপাঠ শুনতে রাজবাড়ি পৌঁছে যায়। সাধারণ মানুষের জন্য রাজবাড়ির সিংহ দরজা খুলে দেওয়া হত।
স্থানীয়দের কথায়, ১৯৩২ সালে দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর সকালে প্রত্যুষ প্রোগ্রাম নামে একটি অনুষ্ঠান রেডিওতে প্রথম সম্প্রচার হয়েছিল। পরের বছর নাম হয় প্রভাতী অনুষ্ঠান। ১৯৩৪ সালে প্রথমবারের মতো মহালয়ার সকালে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হয় মহিষাসুর বধ। ১৯৩৭ সালে স্থায়ী ভাবে নামকরণ হয় মহিষাসুরমর্দিনী। সেই বছরে ঝাড়গ্রামের বাসিন্দারা রাজবাড়িতে রেডিওতে প্রথম মহালয়া শুনেছিলেন। বর্তমানে রেডিওর জায়গা নিয়েছে মোবাইল, ল্যাপটপ, অনলাইন সম্প্রচার। রেডিওর স্টেশন ধরতে আর নব ঘোরাতে হয়না। ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়ার ভয় সেই অর্থে নেই। সময়ের পরিববর্তন হলেও মহালয়ার ভোরে চন্ডীপাঠ শোনার অগ্রহ এখনও কমে যায়নি। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুরনো রেডিওটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঝাড়গ্রামের শহর হয়ে ওঠার স্মৃতি।
রাজপরিবারের সদস্য বিক্রমাদিত্য মল্লদেব বলেন, নরসিংহ মল্লদেব আমস্টারডাম থেকে রেডিওটি কিনে এনেছিলেন। ১৯৩৭ সালে রাজবাড়িতে প্রথমবার মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠান শোনা হয়েছিল। পরিবারের বড়রা রেডিওর সামনে বসতেন। মহিলারা খড়খড়ির পিছন থেকে মহালয়া শুনতেন। শহরের বাসিন্দাদের জন্যও আলাদা বসার ব্যবস্থা থাকত। সেই রেডিওটি সারানোর চেষ্টা চলছে।
শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব প্রদীপ আচার্য বলেন, বাবার ১০৪ বছর বয়স। মহালয়ার ভোরে এখনও রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনী শোনেন। বাবার মুখে শুনেছি, রাজবাড়িতে যখন রেডিও এসেছিল এলাকায় হইচই পড়ে গিয়েছিল। শহরের প্রবীণ নাগরিকরা মহালয়ার ভোরে রাজবাড়িতে মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠান শুনতেন। যুগ বদলে গিয়েছে, প্রযুক্তিও বদলেছে। সেইসঙ্গে বদলেছে আমাদের ঝাড়গ্রামও। কিন্তু মহালয়ার ভোরে রাজবাড়িতে রেডিওতে চণ্ডীপাঠ শোনার স্মৃতি আজও মুছে যায়নি।-নিজস্ব চিত্র