নয়াদিল্লি: চলমান সময় শাটারের ক্লিকে হয়ে উঠত জাদু। ম্যাজিক আঙুলের ছোঁয়ায় ফ্রেমে আটকে যেত মূল্যবান সব মুহূর্ত। জীবন্ত হয়ে উঠত ফেলে আসা সময়। কয়েক দশক ধরে এভাবে ভারতকে ধরেছেন, জীবনকে ধরেছেন, ঘটনাক্রমকে ধরে গিয়েছেন রঘু রাই। রাজনীতি, যুদ্ধ, ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা থেকে সংস্কৃতি জগৎ, ছবিদুনিয়ার যাবতীয় কিছু তাঁর লেন্সের ভল্টে গচ্ছিত। সে ভল্টের চাবি গোটা ভারতের কাছে জমা রেখে তারার দেশে পাড়ি দিলেন কিংবদন্তী ‘মিস্টার রাই’। রবিবার থমকে গেল ভারতের ‘চিত্র সাংবাদিকতার পথিকৃৎ’ রঘু রাইয়ের পথ চলা। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩।
তাঁর ‘কলকাতা সিরিজে’র ছবিগুলিতে ধরা পড়েছে গঙ্গার ঘাটে সকালের স্নান, হাওড়া ব্রিজের নীচে শান্ত জনজীবন, ময়দানে যোগাভ্যাস কিংবা মেঘে ঢাকা শহরের আকাশ, প্রতিমা নিরঞ্জন।
শুধু ভারত নয়, বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ক্যামেরায় ধরা তাঁর। আর সেই ছবিগুলি হয়ে উঠেছে প্রবহমান সময়ের জীবন্ত দলিল। ছেলে নীতিন রাই জানিয়েছেন, দু’বছর আগে তাঁর বাবার প্রস্টেট ক্যানসার ধরা পড়ে। তা থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও পাকস্থলিতে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে। আবার চিকিৎসা শুরু হয়। এদিন সকালে দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। নীতিনের কথায়, ‘সম্প্রতি ক্যনসার ছড়িয়ে পড়ে তাঁর মস্তিষ্কেও। তাছাড়া বয়সজনিত সমস্যাও গ্রাস করেছিল রঘু রাইকে।’ রবিবার সন্ধ্যায় লোধি ক্রিমেটোরিয়ামে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝং শহরে জন্ম রঘু রাইয়ের। প্রকৃত নাম রঘুনাথ রায়চোধুরী। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হোক। সেইমতো তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। তবে ছবি তোলা যাঁর ধ্যানজ্ঞান, তাঁকে আকৃষ্ট করেনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জীবন। ২৩ বছর বয়সে তিনি চিত্র সাংবাদিক হিসাবে একটি সংবাদপত্রে যোগ দেন। আর পরের বছরই তিনি সেই সংবাদপত্রের চিত্র সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান হন। তবে জীবনের বিচিত্র গতিপথে বারবার চাকরি ছেড়েছেন। নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। তবে থেমে থাকেনি লেন্সে নজর।
ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার ভয়াবহতা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগুন জ্বলা সময়। ইন্দিরা গান্ধী, মাদার টেরিজা, দলাই লামা, সত্যজিৎ রায়, পণ্ডিত বিসমিল্লা খান, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া তাঁর ক্যামেরায় ধরা দিয়েছে নতুন রূপে। ৬ দশক ধরে ভারতের বদলে যাওয়া আর্থ-সামাজিক কাঠামোর সাক্ষী ‘পদ্মশ্রী’ রঘু রাইয়ের ক্যামেরা। আধুনিক ভারতের ‘ভিস্যুয়াল রেকর্ড’ বলা হয়ে থাকে তাঁকে। বিশ্বখ্যাত ফ্রান্সের ফটোগ্রাফার হেনরি কার্টিয়ার ব্রেসন তাঁর কাজে আকৃষ্ট হয়ে ১৯৭৭ সালে রঘু রাইকে ‘ম্যাগনাম ফটোস’-এ যোগ দিতে বলেন। খুব কম মানুষই বিশ্বের অন্যতম এই অভিজাত প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পান। ২০১৭ সালে তাঁকে ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে সম্মানিত করে কেন্দ্র। ফাইল চিত্র