Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

কেমন দেখতে ছিল হারিয়ে যাওয়া নৌকা, ইতিহাস খুঁজে বেড়ান হাওড়ার বোটম্যান স্বরূপ

কেমন দেখতে ছিল হারিয়ে যাওয়া নৌকা, ইতিহাস খুঁজে বেড়ান হাওড়ার বোটম্যান স্বরূপ
  • ২৫ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
সংবাদদাতা, উলুবেড়িয়া : ‘মধু মাঝির ওই যে নৌকাখানা বাঁধা আছে রাজগঞ্জের ঘাটে, কারও কোনও কাজে লাগছে না তো... আমায় যদি দেয় তারা নৌকাটি... আমি কেবল যাই একটিবার/ সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার...’ রবীন্দ্রনাথ খোকার মুখ দিয়ে যে নৌকাটির কথা বলছেন, সেটি কোন জাতের নৌকা? ময়ুরপঙ্খী, বজরা, ডিঙি, বেতনাই, ধোলাইম ছোট, ডোঙা, খারো কিস্তি না কি অন্য কিছু? তা এখন আর জানা সম্ভব নয়। তবে এই নামগুলি কি চমকে দিল? দিলেও চমকানোর কিছু নেই। উল্টে শুনলে ভালো লাগবে, একদা বাংলার নদীপথে তরতর করে চলে বেড়াত এই নামের সব নৌকাগুলি। ইতিহাস খুঁড়ে সেগুলিকে উদ্ধার করেছেন গবেষক স্বরূপ ভট্টাচার্য। বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসকে বাঁচিয়ে তুলতে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন এই নৌকা বিশারদ। 
Advertisement
স্বরূপবাবুর কাছে সব নৌকাই আদরের। ৫০টির মত বিভিন্ন ধরনের নৌকা তিনি বানিয়েছেন। যার মধ্যে অনেকগুলি স্থান পেয়েছে বিভিন্ন মিউজিয়ামে। এখনও নিজের বাড়িতে ৫/৬ টা নৌকা আছে। বছর খানেক আগে শ্যামপুরের ঝুমঝুমির ঐতিহ্যবাহী ছোট নৌকাকে গুজরাটের ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়ামে রাখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ভারতের অ্যানথ্রোপলজি বিভাগের গবেষক স্বরূপ ভট্টাচার্য। নৌকা তৈরির পর মাসখানেক আগে সেটিকে কলকাতায় নিয়েও যাওয়া হয়েছে। নৌকার ইতিহাস নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি এই জলযান বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। 
স্বরূপবাবুর বক্তব্য, বাংলা ছিল নৌকার স্বর্গরাজ্য। এরকম ট্রাইপলজিক্যাল ভ্যারাইটি পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। নৌকা নিয়ে সঠিক কোনও তথ্য না থাকায় জানা যায় না কত ধরনের নৌকা ছিল। তথ্য না থাকার কারনেই খোরোকিস্তি, সুলতানি নৌকার কথা বহু মানুষ জানেন না। ১৯৯৭ সাল থেকে নৌকা নিয়ে গবেষণা করছি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অ্যান্ড সায়েন্স টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের একটি প্রজেক্টে কাজ করার সুবাদে নৌকা নিয়ে গবেষণা করার সূযোগ মেলে। তিনি জানালেন, নদী বা জলপথ কমে গিয়ে নৌকার সংখ্যা কমেছে। নদী মজে গিয়েছে ফলে নৌকা আর চলে না। এছাড়াও  ব্যবহারও কমে যাচ্ছে। কারন আমরা এখন সড়ক নির্মাণে বেশি নজর দিয়েছি। এর পাশাপাশি নৌকা নির্মাতারাও বহু প্রতিকূলতার সম্মুখীন। যে কাঠে নৌকা বানানো হতো তা ছিল মজবুত। তা আর মেলে না। এখন নৌকা বানানো হলে যা দাম হবে তাও খুব বেশি। ফলে স্থানীয় গাছের কাঠ দিয়ে নৌকা বানানো হচ্ছে। টেঁকসই হচ্ছে না। এছাড়াও নদীর জলকে অন্য কাজে ব্যবহার করার জন্য নদীর নাব্যতা কমছে। ফলে নৌকা যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। বজরা বা পানসি বা ময়ূরপঙ্খী জাতীয় প্রাইভেট নৌকা প্রায় দেখা যায় না। তবে সরকার এরকম নৌকার আদলে তৈরি জলযান পর্যটনে ব্যবহার করছে। 
সবমিলিয়ে বাঙালির ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই পরিবহণ বিস্মৃতির অতলে। তবে রবীন্দ্রনাথের খোকার মতো কোনও শিশু যদি সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার যেতে চায়...ভবিষ্যতের সে শিশুদের জানার জন্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন স্বরূপবাবু। এখন বহু মানুষ তাঁকে বোটম্যান নামে ডাকে। 
সম্পর্কিত সংবাদ