Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বাম-অশান্তির স্মৃতি মুছে অহিংস ভোট চায় কেশপুর, ‘এসআইআর করেও পারবে না বিজেপি’, প্রত্যয়ী তৃণমূল

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন। ভোট প্রক্রিয়া শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে হরিহরপাড়ায় খুন হন ৪৮ বছরের তৃণমূল কর্মী উত্তম দোলুই

বাম-অশান্তির স্মৃতি মুছে অহিংস ভোট চায় কেশপুর, ‘এসআইআর করেও পারবে না বিজেপি’, প্রত্যয়ী তৃণমূল
  • ১ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতেশ বসু, কেশপুর: ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন। ভোট প্রক্রিয়া শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে হরিহরপাড়ায় খুন হন ৪৮ বছরের তৃণমূল কর্মী উত্তম দোলুই। অভিযোগের তির, বিজেপির দিকে। আওয়াজ উঠল, এক সময়ের সিপিএমের হার্মাদরাই এখন বিজেপির জল্লাদ। এই ঘটনা ফিরিয়ে এনেছিল ১৯৯৮ পরবর্তী দগদগে স্মৃতি। তৃণমূলের উপর অত্যাচারের জেরে কেশপুরজুড়ে রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক সেই সংঘর্ষ। আরও পাঁচটা বছর পার। পুরানো দিনের মানুষরা এখনও কেঁপে ওঠেন... বাম জমানার সেই দিনগুলো মনে পড়ে তাঁদের। এক সময় সিপিএমের লালের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছিল রক্তের লাল। কিন্তু এখন? আর নয়। ছাব্বিশে ওই স্মৃতির আর পুনরাবৃত্তি চাইছে না কেশপুর। ওই পথে হাঁটতে চায় না আর এই মুহূর্তের রাজনীতিও। তাই কেশপুরে এবার লক্ষ্য একটাই—‘অ্যাকশন’হীন অহিংসার নির্বাচন।

Advertisement

লড়াই হবে। অবশ্যই। কিন্তু গণতন্ত্রের পথে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সুর বেঁধে দিয়েছেন। আর সেটাই মন্ত্র করে ভোটের ময়দানে নেমেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এসআইআরে নাম কাটা যাচ্ছে, ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রান হচ্ছেন, নানারকম নেতিবাচক মত ছড়াচ্ছে... তারপরও এই ভোটযুদ্ধে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে যদি কেউ থেকে থাকেন, তাঁর নাম শিউলি সাহা। তৃণমূলের দু’বারের বিধায়ক। এবারেরও প্রার্থী। জয় নিয়ে তিনি ১০০ শতাংশ ‘নিশ্চিত’। বলছিলেন, ‘মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ভোট দেবে। বাড়ি বাড়ি ১০০টি সমাজকল্যাণ মূলক প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ভোট দেবে। সেটা যদি বিজেপির জল্লাদরা রুখে দিতে চায়, তার উত্তরও মানুষ ইভিএমে দেবে।’ 
‘হিংসার কেশপুর’ শিরোনাম মানুষের মন থেকে মুছে যাওয়া উচিত বলে উপলব্ধি করছেন এখানকার বাম নেতারাও। সিপিএম প্রার্থী গুরুপদ মণ্ডল জানিয়েছেন, ‘এখন কেশপুরের মানুষ ভীষণ সচেতন। অশান্তি হলে মানুষ ভালোভাবে নেবে না।’ একই সুর বিজেপিরও। এবার তারা প্রার্থী বদলের পথে হেঁটেছে। শুভেন্দু সামন্ত এবার তাদের সৈনিক শিউলির বিরুদ্ধে। এলাকায় বিজেপির অন্দরমহলই স্বীকার করছে, দু’গোল খেয়ে লড়াই শুরু করতে হচ্ছে তাদের। প্রথম গোল, তৃণমূলের শক্ত জমি এবং ‘আস্থাভাজন’ বিধায়ক শিউলি সাহা। আর দ্বিতীয় গোল, এসআইআর হয়রানি নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ। ২৮ শতাংশ সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী ভোট এখানে। লাগাতার তাঁদের দাঁড়াতে হয়েছে লাইনে। নাম বাদ গিয়েছে। হয়রানি বেড়েছে। সঙ্গে অসন্তোষও। তার রেশ ইভিএম পর্যন্ত যে থাকবে, সে ব্যাপারে কোনো মহলেরই সংশয় নেই। তার প্রমাণ মিলল কেশপুর বাজারের একটি জটলায়। সকালবেলা। বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন টোটো গ্যারাজে আট-দশজন কার্যত মিটিং বসিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু কেন? জানা গেল, ১৯৬৭’র আগে থেকে কেশপুরে বসবাসকারী তাঁদেরই এক পরিচিত ব্যক্তির পরিবারের সকলের নাম বাদ পড়েছে। অথচ জনৈক ব্যক্তির বাকি ভাইয়েদের পরিবারের সকলের নাম রয়েছে চূড়ান্ত তালিকায়! খবর পেয়ে ইচ্ছাইপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, সত্যিই বিচারাধীন থাকা সিদ্দিকি মির্জার পরিবারের ছ’জনের নাম বাদ। একচালা বাড়ির দাওয়ায় খালি গায়ে বসে রয়েছেন ৭৯ বছরের বৃদ্ধ। দিশাহারা। বুকের পেসমেকার ওঠানামা করছে হৃদস্পন্দনের সঙ্গে। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের দৌলতে এই পেসমেকার বসেছিল এসএসকেএম হাসপতালে। তাঁর স্ত্রী ধরা গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘এরপর কী হবে বলতে পারেন? কী দোষ করেছি? আমরা তো এখানকার আদি বাসিন্দা! এখানে থাকতে পারব তো? চিকিৎসা করাতে গেলেও বাধা দেবে না তো?’ ওই গ্রাম-পথ ধরে আরও কিছুটা এগতেই বাড়ি আদিবাসী সমাজের সত্তরোর্ধ্ব খোকন মুর্মুর। এলাকাবাসী না বললে তিনি জানতেই পারতেন না অতিরিক্ত তালিকায় তাঁর নাম নেই! সব মিলিয়ে কেশপুরে বাদ পড়েছে প্রায় ১৫ হাজার ভোটারের নাম। তাঁদের মধ্যে অনেককেই ইচ্ছাকৃত ‘সরিয়ে দেওয়া হয়েছে’ বলে দাবি তৃণমূলের। ফুঁসছে তারা। ফুঁসছে মানুষও। আর ততই দৃঢ় হচ্ছে অধিকার রক্ষার জেদ। ‘জবাব’ দেওয়ার প্রবল ইচ্ছে। লড়াই হবে... কোমর বাঁধছে কেশপুর। ভোটের দিন। ইভিএমে। অহিংস লড়াই।

সম্পর্কিত সংবাদ