সংবাদদাতা, রানাঘাট: সাইকেলের ক্যারিয়ারে ঘানিতে পেষাই সরষের তেলের ড্রাম। হ্যান্ডেলে থলেতে তেল, হলুদ ও জিরের গুঁড়ো ফেরি করেন শান্তিপুরের ডংক্ষিরা গ্রামের ষাটোর্ধ কাশীনাথ বিশ্বাস। ফেরি করে উপার্জিত অর্থ খরচ করেন পিছিয়ে পড়া আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার প্রসারে। সামাজিক অবক্ষয়ের যুগে কাশীবাবুর এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা সমাজকে এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। বর্তমান সমাজে যেখানে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত মানুষ। সেখানে সামান্য ফেরিওয়ালার এই উদ্যোগ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
শান্তিপুরের আরবান্দি -২ গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত তালপুকুর জিএসএ প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থিত। উন্নয়নের সুফল যেখানে সেভাবে পৌঁছায়নি। প্রতিবছর সেই পিছিয়ে পড়া এলাকার শিশুদের জন্য বইপত্র নিয়ে হাজির হন কাশীনাথবাবু। তিনি ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। ঘানিতে পেষাই সরষের তেল, হলুদ ও জিরের গুঁড়ো সাইকেলে করে বিক্রি করেন। অকৃতদার কাশীবাবুর আপন বলতে আর কেউ নেই। এই মানুষটি নিজের অভাবকে কোনোদিন বড়ো করে দেখেননি। ব্যাবসা থেকে উপার্জনের টাকা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় না করে, তিনি আদিবাসী পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষার প্রসারের জন্য বেছে নিয়েছেন।
ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক জগৎজ্যোতি ঘোষ জানান, কাশীবাবুর এই উদ্যোগ এককথায় অবিশ্বাস্য। লকডাউনের আগে যখন তার ব্যবসা ভালো ছিল তখন তিনি একসঙ্গে সাতটি প্রাথমিক স্কুলে বইপত্র পৌঁছে দিতেন। বর্তমানে ব্যবসায় মন্দা চলছে। তা সত্ত্বেও তিনি হাল ছাড়েননি। প্রতিবছর নিজের সামান্য রোজগার থেকে এখন একটি করে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের হাতে শিক্ষা সামগ্রী বুক তুলে দিচ্ছেন। চলতি বছরেও তিনি ওই স্কুলের ১০০ জন ছাত্রছাত্রীর হাতে শিক্ষার সামগ্রী তুলে দিয়েছেন।
কাশীনাথবাবু জানান, সচেতনতার অভাবেই নিজে বেশি দূর পড়তে পারিনি। ছাত্রছাত্রীদের যেন বড় হয়ে আমার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে না হয়। আমি চাই, এই গ্রাম থেকে আগামী দিনে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হোক।
তিনি কেবল ফেরিই করেন না, গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে শিশুদের পড়াশোনার খোঁজ নেন। শিক্ষাদানের বিষয় নিয়েও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। কাশীবাবুর দুই প্রতিবেশী পারুল ভূমি ও সোনালী ভূমি জানান, তিনি যেভাবে বছরেরপর বছর ধরে শিশুদের পড়াশোনার জন্য তেল, মশলা ফেরি করে উপার্জিত অর্থ ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই বিরল। -নিজস্ব চিত্র