


মুম্বই: ১৯৯৯ সালে কার্গিলের প্রান্তরে জীবন বাজি রেখে লড়েছিলেন ল্যান্সনায়েক হাকিমুদ্দিন শেখ। শুধু তিনি নন, পরিবারের আরও অনেক সদস্য কর্মরত ছিলেন ভারতীয় সেনায়। ১৯৬৫’র ভারত-পাক যুদ্ধে পরমবীর চক্র প্রাপক হাবিলদার আব্দুল হামিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন কাকা শেখ নইমুল্লা খান। ভারত-চীন যুদ্ধেও অংশ নেন। আর এক কাকা শেখ মহম্মদ সেলিমও সেই সময় ভারতীয় সেনার সুবেদার ছিলেন। শুধু ১৯৬৫ নয়, ১৯৭১’এর ভারত-পাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনিও। এবার দেশের সেই বীরযোদ্ধার পরিবারকেই ‘বাংলাদেশি’, ‘রোহিঙ্গা’ বলে দাগিয়ে দিল হিন্দুত্ববাদী ব্রিগেড। নাগরিকত্বের ‘প্রমাণ’ চেয়ে গত শনিবার মধ্যরাতে তারা রীতিমতো চড়াও হল পুনের চন্দননগরে হাকিমুদ্দিনদের বাড়িতে। ধর্ম তুলে গালিগালাজের পাশাপাশি ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান তুলে চলল তাণ্ডব। আর এই পুরো দৃশ্যের নীরব দর্শক হয়ে থাকল মহারাষ্ট্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন মহাযুতি সরকারের পুলিস। হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডবে সঙ্গ দিল তারা। হেনস্তা করা হল হাকিমুদ্দিনের ভাই ইরশাদ সহ পরিবারের বাকি সদস্যদের। দেশজুড়ে বাঙালিদের উপর অত্যাচারের ঘটনা বাড়ছে। বাংলা বললেই বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রশাসন। কার্গিল যোদ্ধা হাকিমুদ্দিন অবশ্য বাঙালি নন। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের হাত থেকে তাঁর পরিবারও বাঁচল না।
ঠিক কী ঘটেছে? ইরশাদের দাবি, শনিবার একটু তাড়াতাড়িই রাতের খাওয়া সেরে শুতে যাচ্ছিলাম। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ আচমকাই দরজায় ধাক্কা। ঠিক সাধারণ ধাক্কা নয়, একের পর এক লাথি। সঙ্গে চিৎকার, ‘এখনই দরজা খোল, নাহলে ভেঙে দেব!’ এক ঝটকায় সকলের ঘুম চৌপাট হয়ে যায়। মহিলা-বাচ্চারা ভয় কাঁপছিল। দরজা খোলামাত্র ভিতরে ঢুকে পড়ে ৩০-৪০ জন। প্রত্যেকের এক রা— ‘আধার কার্ড দেখা এখনই। তোরা সবাই বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা! এদেশে তোদের থাকার কোনও অধিকার নেই।’ বাইরে আরও জনাত্রিশেক লোক। তাদের গলায় ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান। নীরবে পায়চারি করছিল কয়েকজন পুলিসও। পরিবারের সকলের আধার কার্ড দেখিয়েও রেহাই মেলেনি। সেগুলিকে ‘ভুয়ো’ বলে ছুঁড়ে ফেলে দেয় উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদী জনতা। এমনকী কার্ড ইস্যু করা সরকারি আধিকারিকদেরও পিটিয়ে মারার নিদান হাঁকে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চলার পর আসরে নামে পুলিস। সকলকে বুঝিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় পরিবারের ১০ জন পুরুষ সদস্যকে। ইরশাদের অভিযোগ, ‘তাণ্ডবকারীরা কোনও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য ছিল। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও কোনও পদক্ষেপ করেনি পুলিস। উল্টে আমাদের থানায় ধরে নিয়ে যায়। নথি যাচাইয়ের নামে ভোররাত পর্যন্ত আটকে রাখা হয়। পরে আমাদেরই চাপ দেওয়া হয়। বলা হয়, এনিয়ে যাতে কোথাও মুখ না খুলি।’
হাকিমুদ্দিন উত্তরপ্রদেশের প্রতাপগড়ের বাসিন্দা। কার্গিল যুদ্ধের পর, ২০০০ সালে ভারতীয় সেনার ইঞ্জিনিয়ার রেজিমেন্টের হাবিলদার হিসেবে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি উত্তরপ্রদেশে থাকলেও ১৯৬০ সাল থেকে ইরশাদ সহ বাকি দুই ছোট ভাই পুনের চন্দননগর এলাকার বাসিন্দা। গোটা ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন তাঁরা। হতাশ গলায় বলছিলেন ইরশাদ, ‘আমার দাদা, কাকারা দেশের হয়ে একের পর এক যুদ্ধে লড়েছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় বোমা হামলায় আমার এক কাকা জখম হয়েছিলেন। পরে তাঁকে ভারত সরকারের তরফে সম্মানিত করা হয়। ৪০০ বছর ধরে এদেশে বসবাস করছি। আর আমাদেরই এভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।’ সরব হয়েছেন হাকিমুদ্দিন শেখও। তাঁর বক্তব্য, ১৬ বছর ধরে দেশকে পরিষেবা দিয়েছি। আমাদের কাছে কেন নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হবে? পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে সাফাই দিয়েছেন পুনের ডিসিপি সোমায় মুন্ডে। বলেছেন, এলাকায় অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। সেইসূত্রেই পুলিস ওই বাড়িতে গিয়েছিল।