


নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: শিল্পা বসু। শক্তিনগর গার্লস হাইস্কুলের রসায়ন বিদ্যার শিক্ষিকা। স্বামী দেবরাজ পাল বালুকা হাইস্কুলে পদার্থবিদ্যা পড়ান। কৃষ্ণনগরে ফ্ল্যাটের কিস্তি গুনতে হয় মাসে ২০ হাজার টাকা করে। সন্তানের বয়স ছ’বছর।
শক্তিনগর গার্লস হাইস্কুলের অপর এক শিক্ষিকা শরিফা খাতুন। বিষয় ইংরেজি। পরিবারের প্রায় প্রত্যেকেই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। শরিফার বাড়ি মুর্শিদাবাদে। বিয়ের পর থেকে পলাশীর বাসিন্দা।
পূর্ব মেদিনীপুরের পঞ্চগ্রাম শিক্ষা নিকেতনের এডুকেশনের শিক্ষক রতন বারিক আবার পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য। বৃদ্ধ বাবা-মা এবং দুই ছোট ভাইয়ের দেখভাল তিনিই করেন। ভাইয়েরা এখনও পড়াশোনা করছে।
উপরোক্ত তালিকা আরও দীর্ঘ। তবে আপাতত এইসব নামের মধ্যে অন্যতম প্রধান মিল একটিই—এঁরা প্রত্যেকেই ২০১৬ সালের প্যানেলে চাকরিহারা। সম্প্রতি শীর্ষ আদালতের রায়ে বদলে গিয়েছে তাঁদের জীবনটা। যেমন, দেবরাজ এবং শিল্পা— স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরিহারা। দৈনন্দিন রোজনামচার পাশাপাশি ফ্ল্যাটের হাজার হাজার টাকা মাসিক ইএমআই কীভাবে শোধ করবেন, তা মনে করলেই রাতের ঘুম উড়েছে তাঁদের। শরিফা খাতুনের পরিবারের চারজন একসঙ্গে চাকরি হারিয়েছেন। শরিফা নিজে এবং তাঁর দাদা, বৌদি ও মাসতুতো বোন। রতনবাবু ২০১৬ সালের শিক্ষক প্যানেলিস্ট শুনেই বছরখানেক আগে পাত্রীপক্ষ বিয়ে বাতিল করে দিয়েছে পত্রপাঠ। চাকরি হারানোর যন্ত্রণা এবং মেয়ের বাড়ির সেই অপমান, রতন বারিকের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে মুহূর্তেই। আজ, বৃহস্পতিবার দেশের প্রধান বিচারপতির এজলাসে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের মামলাটি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। পর্ষদের আবেদন, যতদিন পর্যন্ত নতুন নিয়োগ হচ্ছে অথবা শিক্ষাবর্ষ সম্পন্ন হচ্ছে, ততদিন যোগ্য চাকরিহারাদের চাকরি বহাল রাখা হোক। এখন সুপ্রিম কোর্টের দিকে তাকিয়ে চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীরা।
এদিন কলকাতায় নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে এক সভায় ফের চাকরিহারাদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ২৬ হাজারের চাকরি একতরফাভাবে বাতিল হয়েছে। বিজেপি শিক্ষকদের চাকরি খেয়েছে। যোগীরাজ্যে ৬৯ হাজার শিক্ষকের চাকরি গিয়েছে। ত্রিপুরাতেও ১০ হাজার শিক্ষককে চাকরি দিতে পারেনি বিজেপি সরকার।
বুধবার নয়াদিল্লির যন্তরমন্তরে চাকরি হারানোর প্রতিবাদে অবস্থান-বিক্ষোভ করেছে ‘২০১৬ যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মী অধিকার মঞ্চ’। প্রায় ৪০ ঘণ্টা সড়কপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছেন দিল্লি। আবার রাতেই রওনা হয়েছেন কলকাতার উদ্দেশে। তাঁদের দাবি, ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ওএমআর কপির ‘মিরর ইমেজ’ কর্তৃপক্ষকে দ্রুত প্রকাশ করতে হবে। যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষাকর্মীদের নামের তালিকা সংবাদপত্র এবং এসএসসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
শিল্পা, রতন, শরিফাদের খেদ, আচমকাই পুরো জীবন পাল্টে গিয়েছে। তবে সহকর্মীরা পাশে আছেন। স্কুল কর্তৃপক্ষও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আইনি জটিলতা না কাটলে পরিস্থিতির কোনও উন্নতির আশা নেই। হালিশহর আদর্শ বিদ্যাপীঠের শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডল জানালেন, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করতে চান তাঁরা। ইতিমধ্যেই স্মারকলিপি ইমেল করেছেন। বুধবার যন্তরমন্তর চত্বরে বসেই চলেছে স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ। উঠেছে মুহুর্মুহু স্লোগান—‘হয় বিচার দাও, নাহলে মৃত্যু দাও।’ চলতি মাসের শেষে কল্যাণী এইমসের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাজ্যে যাওয়ার কথা রাষ্ট্রপতির। দিল্লিতে না হলে সেই সময় তাঁর হাতে দাবিদাওয়া তুলে দিতে চাইছেন চাকরিহারা শিক্ষকরা।