সুন্দরবনে যেমন দক্ষিণরায়, জঙ্গলমহলে তেমনি ‘বাঘুত’। অরণ্যভূমিতে বাঘের হানা নতুন নয়। সেখানে লোককথায়, লোকক্রীড়ায়, দেবদেবীর পুজো ও স্থাননামে বাঘের উল্লেখ রয়েছে। জনপ্রিয় লোকক্রীড়া ‘বাঘবন্দি’ এখনও জনপ্রিয়। ঝুমুর গানেও উল্লেখ আছে। বাঘুয়াশোল, বাঘঝাঁপা, বাঘমারির মতো অজস্র গ্ৰাম আছে জঙ্গলমহলে। গ্ৰামীণ এলাকায় গরাম ঠাকুরের সঙ্গে বাঘুত ঠাকুরও পূজিত হন। গাছতলায় গরাম ও শীতলা থানে বাঘুত ঠাকুরের অধিষ্ঠান। তবে দক্ষিণরায়ের মতো বাঘুতের কোনও মূর্তি বা অবয়ব নেই। পোড়া মাটির হাতি ঘোড়ার রূপে গরাম থানে গাছতলায় তাঁর পুজো হয়। ব্যাঘ্র দেবতার উদ্দেশে থানে মুরগি বলি ও ফল-মিষ্টি দেওয়া হয়। কার্তিক মাসে বাঁদনা পরবে গোয়াল ঘরে বাঘুতের পুজো হয়। এছাড়া পয়লা মাঘ আইখ্যান যাত্রার দিনে গরাম থানে তাঁর পুজো হয়। কুড়মি সম্প্রদায়ের পূজারি ‘লায়’ লৌকিক আচারে সেই পুজো করেন। বাঘ দেবতার সন্তুষ্টি বিধানের প্রথা এখানে কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসছে। গ্রাম দেবতার সঙ্গে ব্যাঘ্রদেব তাঁর সন্তুষ্টি বিধানের উদ্দেশ্য ছিল, গৃহস্থের গবাদি পশু যেন জঙ্গলে চরতে গিয়ে অক্ষত থাকে। জঙ্গলে গিয়ে বাসিন্দাদেরও যেন কোনও ক্ষতি না হয়। লালগড়ে বাঘঘরার জঙ্গলে স্থানীয় শিকারিদের হাতে বাঘের মৃত্যুর ঘটনা এখনও তাজা। ব্রিটিশ সরকারের নথিপত্রে উল্লেখ আছে, জঙ্গলমহলে হিংস্র বন্য জন্তু, মূলত বাঘ ও চিতাবাঘ শিকারে উৎসাহিত করতে পুরস্কার দেওয়া হতো। উনিশ শতকে নির্বিচারে শিকারের ফলে জঙ্গল থেকে চিতাবাঘ, বাঘ, ভাল্লুক হারিয়ে যায়। তবে লৌকিক সংস্কৃতিতে বাঘের অস্তিত্ব টিকে রয়েছে। জঙ্গলমহলের বাসিন্দাদের প্রার্থনা ছিল, বাঘুত ঠাকুর এবার বাঘিনী জিনাতকে রক্ষা করুন। সে ফিরে যাক নিজের জঙ্গলে। শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে। বনকর্মীদের হাতে ধরা পড়ার পর জিনাতকে ফেরানো হয়েছে নিজের ঘরে, ওড়িশার সিমলিপাল অভয়ারণ্যে।



