নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: কর্মশালাজুড়ে ছেনি-বাটালির খটখট শব্দ। নিমকাঠের গায়ে একের পর এক আঘাত। সে নিখুঁত আঘাতে ধীরে কাঠের শরীরে ফুটছে বড়ো আকারের চোখ। ওষ্ঠাধরে হাসির আভাস। ধীরে তা দেবমূর্তির অবয়ব হয়ে ধরা পড়ছে। যে কাজ শেষ করতে কমকরে একমাস লাগার কথা। সেই কাজ শেষের সময়সীমা মাত্র তিনদিন। অসম্ভব সম্ভব করার তাগিদে দিন-রাত এক করে কাজ করে চলেছেন বসিরহাট শহরের সাঁইপালার শিল্পী সুবল চন্দ্র ও তরুণ চন্দ্র। তাঁরা সম্পর্কে বাবা-ছেলে। রথযাত্রার চারদিন আগে বসিরহাটের মেরুদণ্ডী এলাকার ৮০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রথ কমিটি জগন্নাথ, বলভদ্র (বলরাম) ও সুভদ্রার কাঠের বিগ্রহ তৈরির বায়না দেয় চন্দ্রদের। পরিস্থিতি কঠিন হলেও কাজ ফিরিয়ে দেননি তাঁরা। দায়বদ্ধতা আর ভক্তির টানে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। তারপর টানা তিনদিন বিরামহীন পরিশ্রম। কাঠে প্রাণপ্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন পিতা-পুত্র। কাঠখোদাই বাংলার প্রাচীন শিল্পচর্চা। ছেনি, বাটালি, হাতুড়ি, ছুরি ও কিছু আধুনিক যন্ত্র নিয়ে নকশা, বিগ্রহ, ছাঁচ, অলংকার ও শৌখিন দ্রব্য তৈরি হয়। সেগুন, শাল, গামার, মেহগনি, আম বা নিম কাঠ ব্যবহার করা হয় সাধারণত। কিন্তু জগন্নাথের বিগ্রহ তৈরিতে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই নিমকাঠের বিশেষ গুরুত্ব। সে প্রথা মেনেই চন্দ্ররা নিমকাঠ দিয়ে গড়ে তুলছেন তিন দেবতার বিগ্রহ। চন্দ্ররা বহুবছর ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তরুণ বলেন, ‘জগন্নাথ, বলভদ্র আর সুভদ্রার সেট বানাতে সাধারণত একমাসেরও বেশি সময় লাগে। কিন্তু এবার সময় খুব কম পেয়েছি। বাবার সঙ্গে মিলে দিনরাত এক করে কাজ করছি। আমাদের কাছে বিষয়টি শুধু রোজগার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে ভক্তি এবং শিল্পের মিলিত সাধনা।’ যদিও সুবল আক্ষেপ করেছেন। বলেন, ‘আগে এই কাজের কদর ছিল। এখন ঠিকমত পারিশ্রমিক মেলে না বলে অনেক শিল্পী অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। তবু আমরা শিল্প সাধনা ছাড়িনি। হাতে যতদিন শক্তি থাকবে ততদিন কাঠে প্রাণ দেওয়ার কাজ করে যাব।’



