


সূর্য থেকে দূরত্বের বিচার করলে সৌরমণ্ডলের চতুর্থ গ্রহ হল মঙ্গল। আর ভরের নিরিখে তৃতীয়। রাতের আকাশে সবচেয়ে বেশি ঝলমলে দেখায় শুক্র গ্রহকে। আমরা যাকে বলি শুকতারা। আর ঔজ্জ্বল্যের দিক থেকে শুক্রের পরেই মঙ্গল। এই পড়শি গ্রহ নিয়ে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। লালগ্রহ ঘিরে কল্পকাহিনি ও নানান ধারণার বিরাম নেই। এর আরও একটি কারণ রয়েছে। বাকি ছ’টা গ্রহের তুলনায় মঙ্গল নিয়ে পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে বেশি গবেষণা করছেন। একদিন এই গ্রহে মানব বসতি গড়ে উঠবে, এমন স্বপ্ন দেখা হচ্ছে। চাঁদের পর এখন মঙ্গলে পা রাখার কথা ভাবছেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই স্বয়ংক্রিয় মহাকাশ যান পাঠিয়ে লালগ্রহে অনুসন্ধানের কাজ চলছে। যদিও সেখানে এখনও মানুষ স্বশরীরে পৌঁছতে পারেনি। ভবিষ্যতে হয়তো মানুষ মঙ্গলে পা রাখবে। এর প্রস্তুতি জোরকদমেই চলছে বিজ্ঞানী মহলে। কিন্তু মহাকাশ যান পাড়ি দিলেই তো হল না। এই গ্রহে রয়েছে বিশাল আগ্নেয়গিরি, গভীর গিরিখাত। তাই সবার আগে খুঁজে বের করতে হবে লালগ্রহের মাটিতে নামার উপযুক্ত জায়গা। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, সেখানে যেন জলের কোনও উৎস থাকে। এ ব্যাপারে নিরন্তর অনুসন্ধানের কাজ চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এবার সেই কাজে সাফল্য মিলল। আমেরিকার মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এমনই একটা জায়গা চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের এই গবেষণা রিপোর্ট সম্প্রতি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
সেই জায়গাটি কোথায়? মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধে আমাজোনিস প্লানিটিয়া অঞ্চলকে মানুষের নামার উপযুক্ত জায়গা বলে মনে করছেন মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। এই জায়গার বিশেষত্ব কী? আমাজোনিস প্লানিটিয়া হল মঙ্গলের বুকে একটা সুবিশাল সমতল এলাকা। এখানে সূর্যের আলো পৌঁছয় পর্যাপ্ত পরিমাণে। কিন্তু তারপরও সেখানে ভূপৃষ্ঠের নীচে বরফ জমে থাকার মতো ঠান্ডা রয়েছে। কাজেই সেখানে ভূপৃষ্ঠের নীচে বরফ রয়েছে বলেই গবেষকদের অনুমান। আর সেই বরফ রয়েছে অল্প গভীরতায়। তাই এখান থেকে বরফ তুলতে খুব একটা কাঠখড় পোহাতে হবে না। বরফ মানেই জলের উৎস। মঙ্গলের এই অঞ্চলের পরিবেশ কীভাবে মানুষের নামার জন্য সুবিধাজনক বলে মনে করছেন মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইরিকা লুজ্জি। তিনি বলেছেন, মঙ্গলে মানুষ পাঠাতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন জল। খাওয়ার জন্য তো বটেই, মহাকাশ যানের জ্বালানি তৈরি সহ আরও অনেক ব্যাপারেই জল প্রয়োজন। তাই ভিন গ্রহে গিয়ে জলের উৎস যাতে হাতের কাছেই থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। আমাজোনিস প্লানিটিয়া অঞ্চলে বরফ ভূত্বকের খুব একটা গভীরে নেই। কাছাকাছাই রয়েছে। ফলে সহজে ওই বরফ তুলে কাজে লাগানো যেতে পারে।
এব্যাপারে একটা কথা বলে রাখা ভালো। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মঙ্গলে জল তরল অবস্থায় নেই। রয়েছে বরফ আকারে। কক্ষপথ থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন গবেষকরা। তাঁদের ধারণা, মঙ্গলের ওই এলাকায় ভূপৃষ্টের এক মিটারেরও কম গভীরে বরফ রয়েছে।
চাঁদে তো জল নেই। সেখানে মানুষ পৌঁছেছে। কিন্তু মঙ্গল অভিযানে জল এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? এর কারণ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর এক গবেষক গিয়াকোমো নোদজৌমি। তিনি বলেছেন, চাঁদের ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ বা তার কম সময়ের মধ্যে পৃথিবী থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া যায়। কিন্তু মঙ্গল গ্রহের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। সেজন্য পৃথিবী থেকে জোগানের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। তাই লালগ্রহে মানুষ পাঠালে সবচেয়ে যে দু’টি জিনিসের প্রয়োজন, তা হল জল ও অক্সিজেন। মঙ্গলে অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম। ওই গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ৯৫ শতাংশ কার্বন-ডাই-অক্সাইড। যে সামান্য পরিমাণে অক্সিজেন রয়েছে, তা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। সেজন্য জলের নিশ্চিত জোগান থাকা দরকার। এজন্যই লালগ্রহে মানুষের পা রাখার জন্য আমাজোনিস প্লানিটিয়া অঞ্চল অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলে মনে করা হচ্ছে।
এবার সেখানকার বরফের নমুনা পেতে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান মিশন পাঠাতে হবে। তারপর আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তারপরই বিজ্ঞানীদের কাছে গোটা বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।