


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: নির্বাচনের মধ্যে একটি রাজনৈতিক জনসভার মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণে অবাক বাংলার মানুষ। ক্ষুব্ধও বটে। কেন কেন্দ্রীয় সরকারি সহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি র্যাঙ্কিংয়ে দেশের প্রথম স্থানে থাকা একটি রাজ্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণের লক্ষ্য করলেন দেশের প্রধান? এই প্রশ্ন তুলছেন সবাই। রাজ্যের গর্ব যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে সেটা ব্যবহারের অপচেষ্টাকে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় প্রত্যাখ্যান করছেন যাদবপুরের শিক্ষক-ছাত্ররাও।
বারুইপুরের জনসভায় মোদি বলেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে দেশবিরোধী স্লোগান লেখা হচ্ছে। পড়াশোনা না করে ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছে। আন্দোলন করছে বাধ্য হয়ে। সেখানে পড়াশোনার পরিবেশ চাই। গোটা বিশ্বে যাদবপুরের নাম সম্মানের সঙ্গে নেওয়া হত। জাতীয়তাবাদ ভিত্তি ছিল। কিন্তু আজ দেখুন ক্যাম্পাসের ভিতরে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। হুমকির বদলে সহমর্মিতা চাই।’ মোদির এই বক্তব্যের বিরোধিতায় ফুঁসে উঠেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাবিদ ও পড়ুয়ারা। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক অনুপম দেব সরকার একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘যাদবপুরে ইসরো, ডিআরডিও বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অনেক গোপন এবং উচ্চ পর্যায়ের গবেষণা চলে। যদি দেশবিরোধীদের আখড়াই হয়ে থাকে, তাহলে সেসব গবেষণা কেন্দ্র এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন? আসলে তারাও জানে কোথায় ভালো কাজ হবে।’ পড়ুয়া ইন্দ্রানুজ রায়ের বিরুদ্ধে অনেক সময়ই দেশবিরোধী স্লোগান দেওয়া বা গ্রাফিতিতে মদত দেওয়ার অভিযোগ তুলে থাকেন উগ্র জাতীয়তাবাদীরা। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রের মাপকাঠিতেই যাদবপুর শীর্ষে থাকে। এরকম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুদান বন্ধ করে দিয়ে, সেন্টার অব এক্সেলেন্স তকমা না দিয়ে, সেই বাবদ অনুদান আটকে ব্যাপক ক্ষতি করছে কেন্দ্রীয় সরকার। শিক্ষার স্বার্থে এসব নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাঁরা যখন আমাদের দেশদ্রোহী বলেন, তখন মনে হয় ঠিক পথেই রয়েছি।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমনকল্যাণ লাহিড়ি বলেন, ‘যে অরবিন্দ ঘোষের কথা মোদির বক্তব্যে উঠে এসেছে, তিনিও বিপ্লবী এবং সন্ন্যাসী জীবনে বারবার জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞাকে পরিবর্তনশীল বলেছেন। তিনি বলেছেন, জাতীয়তাবাদ কোনও স্থির ধারণা নয়। তা সবমসয় গতিশীল। পরিবর্তন ও নৈতিক দায়বদ্ধতার উপরে এর সংজ্ঞা নির্ভরশীল। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, আত্মিক এবং বৌদ্ধিক উন্নতির মধ্যে কোনোকিছু এলে সেটাকে নির্মূল করতে হবে। যাদবপুর শুধু শিক্ষায় নয়, বৌদ্ধিক সাহসের জন্যও সারা দেশে পরিচিত। প্রান্তিক, দুঃস্থ ছেলেমেয়েরা এখানে পড়তে আসেন। তাঁদের প্রতিও এটি প্রধানমন্ত্রীর আক্রমণ।’ অধ্যাপক গৌতম মাইতি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বেসরকারিকরণ নিশ্চিত করেছে। এখন তাদের নজর যাদবপুরে। এই আগ্রাসন সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করব।’
কঠোর মমতা
ব্যথিত হৃদয়ে জানতে চাইছি, যাদবপুরের মতো মর্যাদাপূর্ণ-সম্মানিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী পড়ুয়াদের সম্পর্কে বলার এটাই কি পন্থা? আপনি বলছেন, ওখানে নৈরাজ্য চলছে! পড়াশোনা হয় না। দেশবিরোধীদের আখড়া! অথচ বছরের পর বছর ধরে আপনার সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল র্যাংকিং ফ্রেমওয়ার্ক যাদবপুরকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে চলছে। সেই সেন্টার অব এক্সেলেন্সকে অপমান করতে নেমে পড়লেন? এতটা নীচে নামতে পারলেন? যাদবপুরের পড়ুয়ারা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের বুদ্ধিমত্তাই তাঁদের প্রশ্ন করতে শেখায়। এটা নৈরাজ্য নয়। আপনি বাংলা ছাত্র-যুবদের অপমান করেছেন। এই অপমান আমরা বরদাস্ত করব না।