


দুবাই: কোথা হইতে কী হইয়া গেল, বোঝা গেল না! দস্যু মোহন সিরিজের সেই অমোঘ লাইনই মরুশহরে ধ্রুব সত্যি। কুলদীপ যাদবের ঘুর্ণিজালে আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তান নিশ্চিতভাবেই এটা ভাবছে। কী থেকে যে কী হয়ে গেল, ধরাই গেল না!
রবিবার এশিয়া কাপের ফাইনালে কুলদীপের প্রথম দুই ওভারে উঠেছিল ২৩। চলতি আসরের সর্বাধিক উইকেট শিকারিকে তখন ছন্দহীন লাগছে। মনে হচ্ছে, মোক্ষম দিনেই কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে যাওয়ার মতো কুলদীপও তখন অসহায়। লেগস্পিন জায়গায় পড়ছে না। ওয়াইড হচ্ছে পর পর। প্রমাদ গুনছিলেন ভারতীয় সমর্থকরা। গ্রুপ পর্বে ও সুপার ফোরে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের হেলায় হারানোর পর ফাইনালেই অঘটন ঘটবে না তো!
কে জানত, এরপরই ঘটবে অবিশ্বাস্য প্রত্যাঘাত। চায়নাম্যানের স্পিনের ভেলকিতে মাকড়শার জালে বন্দি পতঙ্গের মতোই অবস্থা হবে বিপক্ষ ব্যাটারদের। যখন দুরুদুরু হৃদয়ে অঙ্ক কষা চলছে, টার্গেট দুশো প্লাস হবে না তো, তখনই তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল পাকিস্তান। আগে থেকে ভেবে রাখা শটই হোক বা ‘ব্রেনলেস ব্যাটিং’— বিশেষজ্ঞরা যে বিশেষণই ব্যবহার করুন, বাস্তব হল কুলদীপের স্পিনের জবাব ছিল না সলমন আগা ব্রিগেডের কাছে। তাঁর পরের দুই ওভারে উঠল মাত্র ৭ রান, এল চার-চারটি উইকেট। তারমধ্যে, তিনটি-ই ১৭তম ওভারে। পাকিস্তান শিবিরে যা লক্ষ্মণের শক্তিশেল হয়েই বিঁধল। ক্যাপ্টেন সলমনের পর ফিরলেন শাহিন আফ্রিদি ও ফাহিম আশরাফ। কুলদীপের সার্জিকাল স্ট্রাইকের পরিণতিতে দেড়শোও পেরল না সবুজ জার্সিধারীদের স্কোর।
একা তিনি নন, পাক ইনিংসে আসলে ড্রোন হামলা চালালেন তিন ভারতীয় স্পিনারই। কুলদীপের চার উইকেট ছাড়াও সফল অক্ষর প্যাটেল এবং বরুণ চক্রবর্তী। তাঁদের পকেটে মোট চার উইকেট। ত্রয়ীর মোট ১২ ওভারে ৮৬ রানের বিনিময়ে এল আট উইকেট। সলমনরা হদিশই পেলেন না ঘূর্ণির। এ যেন প্রাইমারি স্কুলের পড়ুয়াকে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র। তবে ত্রয়ীর মধ্যে ‘এক্স ফ্যাক্টর’ অবশ্যই কুলদীপ। এবারের এশিয়া কাপে তাঁর ঝুলিতে ১৭টি উইকেট। পরিসংখ্যান বলছে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনিই এখন টিম ইন্ডিয়ার তুরুপের তাস। টি-২০ ঘরানায় তিন ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে আটটি উইকেট হল তাঁর। আর পঞ্চাশ ওভারের ফরম্যাটে সংখ্যাটা সাত ম্যাচে ১৫। পাকিস্তান নির্ঘাত আগামী বেশ কিছুদিন ভাববে, কীভাবে আচমকা গলায় চাপল স্পিন-ফাঁদ!
প্রশংসা প্রাপ্য তিলক ভার্মারও। চাপের মুখে দুরন্ত পরিণতি দেখালেন হায়দরাবাদের বাঁ-হাতি। নেমেছিলেন তৃতীয় ওভারে, স্কোর তখন মাত্র ১০। পরের ওভারেই আউট ক্যাপ্টেন সূর্য। ৩৬-৩, ভারত তখন ধুঁকছে। ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স কাপ ফাইনালের অভিশপ্ত স্মৃতি উঁকি দিচ্ছে। এমন সময়েই ভরসা জোগালেন ২২ বছর বয়সি। এবারের আইপিএলেই একবার রান তাড়ার সময় মারতে না পারায় তাঁকে ড্রেসিং-রুমে ডেকে নিয়েছিলেন মুম্বই ইন্ডিয়ান্স নেতা হার্দিক পান্ডিয়া। সেই অপমানই ঘটায় রূপান্তর। গড়ে ওঠে ইস্পাতকঠিন মানসিকতা। শুভমান গিল, সূর্যকুমার যাদবদের ব্যর্থতা ঢেকে দিলেন অনমনীয় সঙ্কল্পে। সঙ্গতে থাকলেন শিবম দুবে। এই আসরে বল হাতে সাফল্য পেলেও ব্যাটে দাপট দেখাননি। তা নিয়ে ফিসফাস ছিলই। এদিন কিন্তু টেনশনেও অদ্ভুত শান্ত থাকলেন। তিলকের সঙ্গে শিবমের জুটিই পৌঁছ দেয় জয়ের কাছে। টানটান উত্তেজনার মধ্যে ভার্মার ব্যাটই অবশ্য নিশ্চিত করল এশিয়াসেরার শিরোপা।
স্কোরবোর্ড: পাকিস্তান- ফারহান ক তিলক বো বরুণ ৫৭, ফখর ক কুলদীপ বো বরুণ ৪৬, আয়ুব ক বুমরাহ বো কুলদীপ ১৪, হ্যারিস ক রিঙ্কু বো অক্ষর ০, আগা ক সঞ্জু বো কুলদীপ ৮, তালাত ক সঞ্জু বো অক্ষর ১, নওয়াজ ক রিঙ্কু বো বুমরাহ ৬, আফ্রিদি এলবিডব্লু বো কুলদীপ ০, আশরাফ ক তিলক বো কুলদীপ ০, রাউফ বো বুমরাহ ৬, আব্রার অপরাজিত ১, অতিরিক্ত ৭। মোট ১৯.১ ওভারে ১০ উইকেটে ১৪৬। উইকেট পতন: ১-৮৪, ২-১১৩, ৩-১১৪, ৪-১২৬, ৫-১৩১, ৬-১৩৩, ৭-১৩৪, ৮-১৩৪, ৯-১৪১, ১০-১৪৬। বোলিং: দুবে ৩-০-২৩-০, বুমরাহ ৩.১-০-২৫-২, বরুণ ৪-০-৩০-২, অক্ষর ৪-০-২৬-২, কুলদীপ ৪-০-৩০-৪, ভার্মা ১-০-৯-০।
ভারত- অভিষেক ক রাউফ বো আশরাফ ৫, গিল ক রাউফ বো আশরাফ ১২, সূর্যকুমার ক আগা বো আফ্রিদি ১, তিলক অপরাজিত ৬৯, সঞ্জু ক ফারহান বো আব্রার ২৪, দুবে ক আফ্রিদি বো আশরাফ ৩৩, রিঙ্কু অপরাজিত ৪, অতিরিক্ত ২। মোট ১৯.৪ ওভারে ৫ উইকেটে ১৫০। উইকেট পতন: ১-৭, ২-১০, ৩-২০, ৪-৭৭, ৫-১৩৭। বোলিং: আফ্রিদি ৪-০-২০-১, আশরাফ ৪-০-২৯-৩, নওয়াজ ১-০-৬-০, হ্যারিস ৩.৪-০-৫০-০, আব্রার ৪-০-২৯-১, আয়ুব ৩-০-১৬-০।
ভারত জয়ী ৫ উইকেটে। ম্যাচের সেরা তিলক ভার্মা