সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: ‘ভারত আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। নরেন্দ্র মোদি আমার বন্ধু।’ একথা শোনা যায় বারবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে। অথচ বৃহৎ অর্থনীতিগুলির মধ্যে ভারতকেই নিয়ম করে সবথেকে বেশি অপমান করে চলেছেন তিনি। আজ, ১ আগস্ট থেকে ভারতের উপর ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক চাপাচ্ছে আমেরিকা। তার ২৪ ঘণ্টা আগেই সমস্ত কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মাত্রা ছাড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়ে দিলেন, ভারতের অর্থনীতি মৃত। এবং তা আরও ডুববে। এখানেই শেষ নয়, নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে ট্রাম্পের আরও কটাক্ষ, ‘আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানের তেল চুক্তি হয়েছে। এরপর পাকিস্তান হয়তো ভারতকে তেল বিক্রি করবে। ভারতকে কিনতে হবে সেই তেল।’ এর জেরেই বৃহস্পতিবার ব্যাপক অস্বস্তিতে মোদি সরকার। সংসদ চত্বরে দাঁড়িয়ে কটাক্ষ করেছেন রাহুল গান্ধী—‘ট্রাম্প ঠিকই তো বলেছেন!’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওয়াশিংটন সফরের অব্যবহিত পরেই একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন ট্রাম্প। বলেছিলেন, ‘বিশ্বের সবথেকে বেশি শুল্ক আদায় করে ভারত। তাদের উপর আমিও সমানভাবে শুল্ক চাপাব। মোদির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমার মুখের উপর কেউ কিছু বলার সাহস পায় না।’ কূটনৈতিক প্রোটোকলের তোয়াক্কা না করার সেই শুরু। তারপর থেকে কার্যত প্রতিদিনই ট্রাম্প যেন সুযোগ খোঁজেন যে, কখন ভারতকে আক্রমণ, তাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা করার মতো বিবৃতি দেওয়া যায়। আর অপারেশন সিন্দুরের পর থেকে আবার ভারত ও পাকিস্তানকে একই মর্যাদা ও গুরুত্বের রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করছেন তিনি। কিন্তু বুধবার ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে কার্যত বোমা ফাটিয়েছেন— ‘রাশিয়ার সঙ্গে ভারত কী চুক্তি করল অথবা না করল, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। এই দুটোই তো আদতে মৃত অর্থনীতি। ওরা নিজেদের মৃত অর্থনীতি নিয়ে মিলিতভাবে ডুবে যাক, আমার কী? ভারত কী মনে করবে, সেসব আমি পাত্তাই দিই না। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য কী? কিছুই না। অতএব আমাদের ওদের গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই।’ আর তারপরই ‘পাকিস্তান’ কটাক্ষ! ইসলামাবাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঠিক কী তেলচুক্তি হয়েছে, সেটা অবশ্য এখনও স্পষ্ট নয়। তবে মনে করা হচ্ছে, পাকিস্তানের তেলভাণ্ডারে মার্কিন কোম্পানির অনুপ্রবেশের সবুজ সংকেত ওই চুক্তি। যদিও ট্রাম্পের এই হুমকি নিছকই শূন্যকুম্ভের ঝংকার। কারণ, ভারত প্রতিদিন গড়ে ৬ লক্ষ ব্যারেল অশোধিত তেল উৎপাদন করে। আর পাকিস্তান মাত্র ৬৮ হাজার। কিন্তু ট্রাম্পের মন্তব্যে গত ১১ বছরের মধ্যে সবথেকে বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে মোদি সরকার। প্রধানমন্ত্রী উপযাচক হয়ে একাধিকবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে অতি উৎসাহী আচরণ করেছেন। তাঁকে বন্ধু বলে তকমা দেওয়া, মার্কিন নির্বাচনে জয়ী করার আহ্বান ইত্যাদি প্রোটোকল বহির্ভূত আচরণ করে সমালোচিতও হয়েছেন। তাই ইদানীং ট্রাম্প যেভাবে ভারতকে প্রতিদিন অপমান করে চলেছেন, তাতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকেই টার্গেট করছে বিরোধীরা। রাহুল গান্ধী এদিন সংসদ ভবনে বলেছেন, ‘ভারতের অর্থনীতি তো মৃতই। একথা সবাই জানে, শুধু মোদি এবং নির্মলা সীতারামন ছাড়া।’ কংগ্রেস সহ ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন দল প্রশ্ন করেছে, মোদিজির মুখে ট্রাম্প সম্পর্কে একটিও কথা শোনা যায় না কেন? রহস্যটা কী? কেন আমেরিকাকে ভয় পাচ্ছেন মোদি? ট্রাম্প যেভাবে চড়া সুরে শুল্ক চাপানোর কথা বলেছেন, তা ভারতের জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করছে। এরপরও কি আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা হবে? এত অপমানজনক শর্তে?
এই আবহে বাণিজ্য চুক্তিকে আমেরিকার সামনে আত্মসমর্পণ হিসেবেই গণ্য করবে বিরোধীরা। প্রচার চলবে তুমুল। রাজনৈতিক শত্রু ইন্ডিয়া জোট নয়, বন্ধু ট্রাম্পকে নিয়েই প্রধানমন্ত্রী এখন মহা উদ্বিগ্ন।