


দুবাই: রবীন্দ্র জাদেজার পুল ডিপ স্কোয়ার লেগ বাউন্ডারি ছুঁতেই গর্জে উঠল গ্যালারি। বাঁ-হাতি অলরাউন্ডারকে দৌঁড়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন নন স্ট্রাইকার প্রান্তে থাকা লোকেশ রাহুল। ততক্ষণে মাঠে ঢুকে পড়েছেন শ্রেয়স আয়ার, অর্শদীপ সিং’রা। ডাগ আউটেও তখন উত্সবের আবহ। হাজার ওয়াটের হাসিতে ঝলমলে বরাবরের গুরুগম্ভীর কোচ গৌতমের মুখ। দুই মহাতারকা বিরাট ও রোহিত জড়িয়ে ধরলেন একে অন্যকে। মাঠে নেমে নাচ শুরু করে দিলেন বাকিরাও। ভারতের তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের মুহূর্ত সত্যিই চিরকালের জন্য সাজানো থাকল ফ্রেমে। আসলে কিউয়িদের কাছে বার বার আইসিসি’র টুর্নামেন্টের খেতাবি লড়াইয়ে মুখ থুবড়ে পড়ার যন্ত্রণা এতদিন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে টিম ইন্ডিয়াকে। অবশেষে মরুশহরে তার শাপমোচন হল। আবেগের বিস্ফোরণ ঘটল রোহিত-বিরাটদের সেলিব্রেশনে। অন্যপাশে তখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। মুখ চুন মিচেল স্যান্টনার বাহিনীর। কেন উইলিয়ামসন, রাচীন রবীন্দ্রদের দেখে মনে হচ্ছিল মাথায় ভেঙে পড়েছে আকাশ।
গত বছর অক্টোবরে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে টি-২০ বিশ্বকাপ জিতেছিল রোহিত শর্মা অ্যান্ড কোং। পাঁচ মাসের মধ্যে আরও একটি আইসিসি ট্রফি জয়। সেলিব্রেশন তো এমন বাঁধনহারাই হওয়ার কথা। ক্যাপ্টেন রোহিতের কাছেও এই জয় বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। খারাপ ফর্মের জন্য ক’দিন আগেও সমালোচনায় বিদ্ধ ছিলেন। ফাইনালে সবাইকে জবাব দিয়ে তিনিই ম্যাচের নায়ক। ক্যাপ্টেন বললেন, ‘এমন সব মুহূর্তেরই তো স্বপ্ন দেখেছিলাম। আরও একটি আইসিসি ট্রফি জিততে পেরে আপ্লুত। টিমের প্রত্যেকের জন্য গর্বিত। পরিকল্পনা করেই টিম গড়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তার পুরস্কার মিলল।’
টাইম মেশিনে একটু পিছনে ফেরা যাক। বর্ডার গাভাসকর ট্রফির শেষ ম্যাচ সিডনিতে জাতীয় দলের ব্লেজার গায়ে চাপিয়ে টস করতে নেমেছিলেন যশপ্রীত বুমরাহ। তখন অধিনায়ক রোহিত শর্মা কোথায়? পরে জানা গেল খারাপ ফর্মের জন্য হিটম্যান নিজেই বেঞ্চে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ব্যস! মুন্ডপাত শুরু। ক্যাপ্টেনের দায়িত্বজ্ঞান, ফিটনেস, ব্যাটিং— প্রভৃতির সমালোচনায় রীতিমতো বিদ্ধ হতে হল তাঁকে। এমনকী বোর্ডও নাকি তাঁকে অবসর নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করে দিতে বলেছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, রোহিতের কেরিয়ার সরু সুতোর উপর ঝুলছিল। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আসরই ছিল নিজেকে প্রমাণের মঞ্চ। আর খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে সেই মঞ্চেই জ্বলে উঠলেন মুম্বইকর। ভারতকে আরও একটা আইসিসি ট্রফি জিতিয়ে সমালোচকদের ডুবিয়ে দিলেন পারস্য উপসাগরে। রবিবার ফাইনালে রোহিতের ব্যাটেই প্রশস্ত হয় ভারতের জয়ের রাস্তা। নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ২৫২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দাপট দেখান শুরুতেই। দ্বিতীয় বলে ছক্কা হাঁকিয়ে হিটম্যান বুঝিয়ে দেন যে তিনি ‘ফুরিয়ে যায়নি’। তাঁর দাপটেই ১৭ ওভারে ১০০ রান উঠে স্কোরবোর্ডে। মাত্র ৪১ বলেই অর্ধশতরানে পৌঁছন শর্মাজি কা বেটা। সেঞ্চুরিও আসতে পারত। কিন্তু রোহিত আর ব্যাক্তিগত মাইলস্টোন নিয়ে কবে ভেবেছেন! দলকে আগে রাখাই যে তাঁর ইউএসপি। শেষ পর্যন্ত তিনটি ছক্কা ও সাতটি চার সহ ৮৩ বলে ৭৬ রানের ইনিংস খেলে স্টাম্পড হন তিনি। সেই ইনিংসই শেষ পর্যন্ত তফাত গড়ে দিল। কারণ, পরের দিকে বল লাট্টুর মতো ঘুরছিল। তাতে দ্রুত রান তোলা মুশকিল হয়ে পড়ছিল।
রোহিতের পাশাপাশি উল্লেখ করতে হবে শ্রেয়স আয়ারের নামও। তাঁর কাছেও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ ছিল। ২০২৩ ওডিআই বিশ্বকাপের পর ঘরোয়া ক্রিকেটে না খেলা নিয়ে বিসিসিআইয়ের রোষের মুখে পড়েছিলেন তরুণ তুর্কি। বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকেও বাদ পড়েন। ২০২৪ টি-২০ স্কোয়াডে তাঁর জায়গা হয়নি। কিন্তু মুষড়ে পড়েননি শ্রেয়স। বরং ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে মেলে ধরে ফের জাতীয় দলে ফেরেন। এবং চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে হয়ে ওঠেন ভারতের মিডল অর্ডারের প্রধান স্তম্ভ। ফাইনালেও কঠিন সময়ে ৪৮ রানের ইনিংস উপহার দেন মুম্বইকর।
স্কোরবোর্ড: নিউজিল্যান্ড: ইয়ং এলবিডব্লু বো বরুণ ১৫, রাচীন বো কুলদীপ ৩৭, উইলিয়ামসন ক ও বো কুলদীপ ১১, মিচেল ক রোহিত বো সামি ৬৩, লাথাম এলবিডব্লু বো জাদেজা ১৪, ফিলিপস বো বরুণ ৩৪, ব্রেসওয়েল অপরাজিত ৫৩, স্যান্টনার রান আউট ৮, স্মিথ অপরাজিত ০, অতিরিক্ত ১৬, মোট (৫০ ওভারে) ২৫১-৭। উইকেট পতন: ১-৫৭, ২-৬৯, ৩-৭৫, ৪-১০৮, ৫-১৬৫, ৬-২১১, ৭-২৩৯। বোলিং: সামি ৯-০-৭৪-১, হার্দিক ৩-০-৩০-০, বরুণ ১০-০-৪৫-২, কুলদীপ ১০-০-৪০-২, অক্ষর ৮-০-২৯-০, জাদেজা ১০-০-৩০-১।
ভারত: রোহিত স্টাঃ লাথাম বো রাচীন ৭৬, গিল ক ফিলিপস বো স্যান্টনার ৩১, কোহলি এলবিডব্লু বো ব্রেসওয়েল ১, শ্রেয়স ক রাচীন বো স্যান্টনার ৪৮, অক্ষর ক ও’রৌরকি বো ব্রেসওয়েল ২৯, রাহুল অপরাজিত ৩৪, হার্দিক ক ও বো জেমিসন ১৮, জাদেজা অপরাজিত ৯ , অতিরিক্ত ৮, মোট (৪৯ ওভারে) ২৫৪-৬। উইকেট পতন: ১-১০৫, ২-১০৬, ৩-১২২, ৪-১৮৩, ৫-২০৩, ৬-২৪১। বোলিং: জেমিসন ৫-০-২৪-১, ও’রৌরকি ৭-০-৫৬-০, স্মিথ ২-০-২২-০, স্যান্টনার ১০-০-৪৬-২, রাচীন ১০-১-৪৭-১, ব্রেসওয়েল ১০-১-২৮-২, ফিলিপস ৫-০-৩১-০। ভারত ৪ উইকেটে জয়ী।