


নয়াদিল্লি: যুদ্ধে জ্বলছে ইরান। অস্থির গোটা পশ্চিম এশিয়া। জ্বালানি সরবরাহের ‘ধমনি’ হরমুজ প্রণালীও বারুদের স্তূপের উপর দাঁড়িয়ে। ফলে তেল ও গ্যাসের সংকটের আশঙ্কায় স্নায়ুর চাপ বাড়ছে ভারতের। তার উপর একেবারে নাকের ডগায় যেভাবে ইরানি রণতরী ধ্বংস করেছে মার্কিন সাবমেরিন, তাতে সমালোচনায় সরব বিরোধী শিবির। ইরানের এই সংকটে ভারত সরকারের অবস্থান ঠিক কী? সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে গত কয়েকদিন ধরে। ঘরে-বাইরে চাপের মুখে পড়ে অবশেষে বৃহস্পতিবার, মার্কিন-ইজরায়েলি হানায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পাঁচদিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে শোকপ্রকাশ করল কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনে কথাও বললেন কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর। সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে দু’জনের কথা হয়েছে বলে খবর। বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রি এদিন দিল্লিতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাসে যান। সেখানে শোকজ্ঞাপনের পাশাপাশি খামেনেই-হত্যা সংক্রান্ত একটি শোকপত্রে স্বাক্ষরও করেন। তাহলে কি ইরান যুদ্ধ নিয়ে পরোক্ষে মার্কিন বিরোধিতার রাস্তায় নয়াদিল্লি? সংঘাতের আঁচ দেশের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়ায় এদিন যুদ্ধবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি স্বয়ং। ভারত সফরে আসা ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেখজান্ডার স্টাবকে পাশে নিয়ে তাঁর বার্তা, সামরিক অভিযান কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারে না।
সম্প্রতি ইজরায়েল সফরে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। ঘটনাচক্রে তিনি দিল্লি ফিরে আসার পরেই ইরানে যৌথভাবে হামলা শুরু করে আমেরিকা-ইজরায়েল। গত শনিবার, যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই মৃত্যু হয় খামেনেইয়ের। প্রত্যাঘাত করে তেহরান। ইজরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে আছড়ে পড়ে ইরানের ড্রোন-মিসাইল। ভারত সরকার অবশ্য ওই দেশগুলির পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে ইতিমধ্যেই। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও ফোনালাপ করেছেন মোদি। অথচ ইরানে মার্কিন-ইজরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মোদি সরকার এতদিন কোনো বাক্যব্যয় করেনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী শিবির অভিযোগ তোলে, দীর্ঘদিনের ভারসাম্যের কূটনীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে ভারত। ইরান সংকট নিয়ে এদিনও মোদি সরকারকে তুলোধোনা করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘অস্থির মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব। বিপদের মুখে ভারতের তেল সরবরাহ। আমাদের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে। পরিস্থিতি আরও খারাপ এলপিজি ও এলএনজির ক্ষেত্রে। সংঘাতের আঁচ আমাদের বাড়ির উঠোনে চলে এসেছে। ভারত মহাসাগরে ইরানি রণতরীর সলিল সমাধি হয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী চুপ!’
বিরোধী আক্রমণ বাড়তে থাকায় অবশেষে এদিন মোদি বলেন, ‘শুধুমাত্র সামরিক অভিযানের মাধ্যমে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। পশ্চিম এশিয়া হোক বা ইউক্রেন, আমরা সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাব।’ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর সঙ্গেও পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে ফোনে কথা বলেছেন তিনি। কিন্তু সবথেকে তাৎপর্যের বিষয় হল, খামেনেইয়ের মৃত্যুতে এদিন ভারত সরকারের তরফে বিদেশ সচিব মিস্রির শোকজ্ঞাপন। ইরানের রাষ্ট্রদূত মহম্মদ ফাথালির সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের ছবিও প্রকাশ করেছে বিদেশ মন্ত্রক। যদিও ইরানের পাশে দাঁড়ানোর ইস্যুতে দলীয়ভাবে কংগ্রেসকে তোপ দেগেছে বিজেপি। দলের নেতা অমিত মালব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘দীর্ঘদিনের মিত্র চীনও ইরান থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। অথচ কংগ্রেস চায় ভারত চোখ বুজে ইরানের পাশে দাঁড়াক।’ একের পর এক বিজেপি নেতার অভিযোগ, ভোট ব্যাংকের রাজনীতি থেকেই ইরানের পাশে দাঁড়ানোর দাবি তুলছে ‘দেশদ্রোহী’ কংগ্রেস। তাহলে কি সরকারের সঙ্গে বিজেপির দলীয় অবস্থানেও ভারসাম্যের অভাব তৈরি হয়েছে? উঠছে সেই প্রশ্ন।