


নন্দিনী মিত্র: আমাদের ফিনল্যান্ড ভ্রমণ দু’টি পর্যায়ে ভাগ করা ছিল। প্রথম পর্বে সিটি ট্যুর। দ্বিতীয় পর্যায়ে ফিনিশ ল্যাপল্যান্ড। ইমিগ্রেশনে অনেকটা সময় অতিবাহিত হল। কলকাতার প্রচণ্ড গরম থেকে যখন হেলসিঙ্কির মাইনাস চার-এ নামলাম, হাড়হিম করা ঠান্ডায় শরীর কেঁপে উঠল। বাসস্ট্যান্ডে আঠারো সিটারের বাস অপেক্ষা করছিল। মালপত্র বাসের পেটের মধ্যে চালান করে দিয়ে সিটে বসার পর কিছুটা স্বস্তি পেলাম।
প্রথম থেকেই বলা ছিল আমরা হোটেলে চেক-ইন না করে আগে সিটি ট্যুর করব। তখন বিকেল সাড়ে তিনটে। আমাদের প্রথম গন্তব্য হেলসিঙ্কি ক্যাথিড্রাল। হেলসিঙ্কির কেন্দ্রস্থল সেনেটা স্কোয়ারে অবস্থিত এই শ্বেতশুভ্র ক্যাথিড্রাল। উঁচু সবুজ তার গম্বুজ। অন্দরসজ্জা অসাধারণ। ১৮৩০ থেকে ১৮৫২ সালের মধ্যে এই চার্চটি নির্মিত হয় গ্র্যান্ড ডিউক অব ফিনল্যান্ড, রাশিয়ান সম্রাট নিকোলাস ওয়ানকে শ্রদ্ধা জানাতে। নিও-ক্লাসিক্যাল স্থাপত্য রীতিতে তৈরি চার্চটির উচ্চতা ৬২ মিটার। এক হাজার তিনশো আসন আছে প্রার্থনা কক্ষে। হেলসিঙ্কির আইকনিক ল্যান্ডমার্ক এই গির্জাটি অবশ্য দর্শনীয় স্থান। চার্চের ডিজাইন করেছিলেন কার্ল ল্যুডভিগ অ্যাঞ্জেল। চার্চের ভেতর মার্টিন লুথারের স্ট্যাচু আছে।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ক্যাথিড্রালের অপর ফুটপাতে অবস্থিত ন্যাশনাল লাইব্রেরি। এটি হেলসিঙ্কি ইউনিভার্সিটির একটি অংশ। লাইব্রেরিটি ফিনিশ সংস্কৃতির রক্ষক, ধারক ও বাহক। তিনতলা লাইব্রেরিটি চোখ জুড়ানো বইয়ের সম্ভারে সুসজ্জিত। ভেতরে ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। লাইব্রেরিতে প্রবেশ করে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। চারদিকে পিন পতনের নীরবতা। ভেতরে বসে কয়েকজন প্রফেসর ছাত্রছাত্রীদের আলাদাভাবে পড়াচ্ছেন। লাইব্রেরির পাশেই হেলসিঙ্কি ইউনিভার্সিটি, বাইরে থেকেই দেখলাম। ইউনিভার্সিটি থেকে একটু হেঁটে উল্টো দিকে রয়েছে দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের স্ট্যাচু, যিনি ফিনিশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এরপর বাসে উঠে কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম গভর্নমেন্ট প্যালেস। পথে পড়ল ওলিম্পিকস স্টেডিয়াম। ১৯৫২ সালের সামার ওলিম্পিকস অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই স্টেডিয়ামেই।
আমাদের পরবর্তী স্টপ পয়েন্ট— কাউপাতোরি স্কোয়ার অর্থাৎ মার্কেট এরিয়া। কিন্তু দুঃখের বিষয় একটা দোকানও তখন খোলা নেই। পাঁচটার মধ্যে সমস্ত দোকান বন্ধ হয়ে যায়। প্রাণচঞ্চল ফিনিশ মার্কেট হেলসিঙ্কি হারবারের খুব কাছেই এসপ্ল্যানেড বুলেভার্ডের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত। এখানে টাটকা ফল, সব্জি, বেকড খাবার পাওয়া যায়। ফুটপাতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ফেরার পথে পড়ল হেলসিঙ্কি হারবার। অসংখ্য বোট দাঁড়িয়ে আছে বন্দরে। দূরে কয়েকটা ছোট জাহাজ। অস্তমিত সূর্যের রক্তিম আভায় কয়েকটা সিগাল উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে। রাস্তায় পড়ল অসংখ্য গির্জা। কিন্তু বাস থেকে নেমে দেখার সময় নেই তখন। তাই গির্জার ছবি লেন্সবন্দি করে সন্তুষ্ট হলাম।
পরদিন আইসল্যান্ড যাওয়ার ফ্লাইট সকাল সাড়ে সাতটায়। ভোর সাড়ে তিনটেয় অ্যালার্ম বাজল। প্যাকড ব্রেকফাস্ট বলা ছিল হোটেলে। ব্রেকফাস্টের মেনুতে দেখি সে এক এলাহি আয়োজন। চিকেন, হ্যাম, সসেজ, সালামি, বেকন, মিটবল, হরেকরকম পাউরুটি, স্যুপ, রকমারি ফল, নানা ধরনের স্যালাড, টাটকা ফলের রস, চা, কফি। অত ভোরে খাওয়া অসম্ভব বলেই আমাদের প্যাকড ব্রেকফাস্ট বলা হয়েছিল। কিন্তু ব্রেকফাস্টের বহর দেখে মনে হল প্যাকড ব্রেকফাস্ট না বললেই ভালো হতো।
ভোর পাঁচটায় বাস ছাড়ল। এয়ারপোর্ট পৌঁছতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল। ছোট্ট, ছিমছাম এই ভান্তা এয়ারপোর্ট। দু’ঘণ্টার উড়ান। প্লেন সারাক্ষণ খুব নীচে দিয়ে উড়ল। আইসল্যান্ড পৌঁছনোর এক ঘণ্টা আগে নীচে নরওয়েজিয়ান সি পরিষ্কার দেখা গেল। ল্যান্ডিংয়ের ঠিক আগেই বরফাচ্ছাদিত টিলা আইসল্যান্ডে আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানাল।
ফিনল্যান্ডের মতোই এয়ারপোর্ট থেকে নেমে হোটেলে চেক-ইন না করে আমরা চললাম সাইট সিয়িংয়ে। আমাদের প্রথম গন্তব্য ‘গোল্ডেন সার্কেল’ পরিদর্শন। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে বাসে বসে প্রথম বরফের দেখা পেলাম আধ ঘণ্টার মধ্যেই। আমাদের উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। ডানদিকে একটা বিস্তীর্ণ বরফাবৃত প্রান্তর। মাঝখানে কয়েকটা ছোট ঢিপি। বাঁ-দিকে বরফাচ্ছাদিত টিলা। বাস থেকে হইহই করে নেমে সকলে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বিদেশি বাচ্চাগুলো বরফের বল বানিয়ে লোফালুফি খেলছে। আধ ঘণ্টা ধরে মনের আনন্দে ছবি আর ভিডিও তুলে আবার বাসে করে রওনা দিলাম। বাস চলল গোল্ডেন সার্কেলের প্রথম আকর্ষণ পিঙ্গভেলির বা থিংগভেলির ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশে।
থিংগভেলির ন্যাশনাল পার্ক আইসল্যান্ডের একটি ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। যা ২০০৪ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। পার্কটি আইসল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী। ৯৩০ থেকে ১৭৯৮ সাল পর্যন্ত এখানে আলথিং (সংসদ)-এর বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হতো। পার্কটি আইসল্যান্ডের প্রথম পার্লামেন্ট।
পার্কটি একটি বিশাল রিফটভ্যালির মধ্যে অবস্থিত, যা উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশিয়ান প্লেটের মধ্যে একটা বিরাট ফাটলের কারণে গঠিত। পার্কের আয়তন ২৪০ বর্গ কিলোমিটার। পার্কটি গোল্ডেন সার্কেলের তিনটি আশ্চর্যের মধ্যে একটি। বাকি দু’টি জিওথার্মাল গেজির এরিয়া ও গুলফস বা গালফস জলপ্রপাত। পার্কে ট্রেকিং ও হাইকিং করার সুবিধা আছে। এটি আইসল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমের রাজধানী রেইকিয়াভিক থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার পূর্বে দেশের বৃহত্তম প্রাকৃতিক হ্রদ থিংভাল্লাভাটন লেকের উত্তর তীরে অবস্থিত।
এর প্রবেশপথটি অত্যন্ত পিচ্ছিল। বরফ কেটে দু’দিকে সরিয়ে মাঝখানে সরু একটুকরো রাস্তা বের করা হয়েছে। সদ্য বরফগলা কর্দমাক্ত, পিচ্ছিল, বন্ধুর রাস্তা ধরে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর বরফাবৃত লোহার সিঁড়ি দিয়ে সন্তর্পণে উপরে ওঠার পর অনবদ্য একটা প্যানোরামিক দৃশ্য দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। অদূরে অক্সারা নদী প্রবাহিত। এই নদী পরে অক্সারাফস জলপ্রপাতে পরিণত হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে নদীর কিনারা পর্যন্ত যাওয়া যায়। বহু বছর পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এইরকম অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের সান্নিধ্য আমাকে মোহাবিষ্ট করে তুলল। প্রায় দু’ ঘণ্টা ধরে পার্কের চারদিক বেরিয়ে বাসে ফিরে এলাম।
আমাদের পরের দর্শনীয় স্থান জিওথার্মাল গেজির এরিয়া। দক্ষিণ-পশ্চিম আইসল্যান্ডের হাউকাডালুর উপত্যকায় অবস্থিত এই বিস্তীর্ণ গিজার এরিয়া ‘গেজির হট স্প্রিং এরিয়া’ নামে অধিক পরিচিত। এই গিজার এরিয়া গোল্ডেন সার্কেলের অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান। এখানে ছোট-বড়-মাঝারি মাপের অসংখ্য গিজার আছে। জিওথার্মাল গিজার হাজার বছরের বেশি সময় ধরে সক্রিয়। তবে আইসল্যান্ডের দক্ষিণার্ধে বারবার ভূমিকম্প হওয়ার ফলে নতুন নতুন হটস্প্রিংয়ের উৎপত্তি হয়েছে। এক ঘণ্টা সময় আছে হাতে। যতটা সম্ভব ঘুরে দেখতে হবে। এগিয়ে চললাম। কিছুটা যাওয়ার পর স্ট্রোক্কুর গিজার দেখতে পেলাম। গিজার এরিয়ার সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ ও জনপ্রিয় এই গিজার। প্রতি দশ মিনিট অন্তর স্ট্রোক্কুর ইরাপ্ট করে এবং প্রায় চল্লিশ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় জলের ফোয়ারা ওঠে। স্ট্রোক্কুর না দেখলে গিজার এরিয়ায় ভ্রমণ অসমাপ্ত থেকে যায়। সমস্ত গিজার এরিয়াটি ধোঁয়ায় ভরা, চারদিকে শুধু হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের তীব্র গন্ধ।
গোল্ডেন সার্কেলের তৃতীয় ও সর্বশেষ আকর্ষণীয় গন্তব্য হল দক্ষিণ-পশ্চিম আইসল্যান্ডে অবস্থিত গুলফস বা গালফস জলপ্রপাত। দৈর্ঘ্যে ও সৌন্দর্যে নায়াগ্রা ফলসের সমগোত্রীয় না হলেও গুলফস ওয়াটার ফলসের একটা চোখ ধাঁধানো, মনমাতানো রূপ আছে। আইসল্যান্ডিক ভাষায় ‘গুলফস’ শব্দের অর্থ ‘গোল্ডেন’। এই জলপ্রপাত আইসল্যান্ডের সর্বাপেক্ষা সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ওয়াটারফলস যা দু’টি ধাপে বিভক্ত। হাভিটা নদী থেকে গুলফস প্রথম ধাপে ১১ মিটার নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিছুটা প্রবাহিত হয়ে দ্বিতীয় ধাপে ২১ মিটার নীচে পড়ে ক্যানিয়নের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। একদম ওপর থেকে গুলফসের সৌন্দর্য অসাধারণ কিন্তু প্রায় সত্তর-আশিটা সিঁড়ি পেরিয়ে নীচে নামলে এর সৌন্দর্য অপার্থিব। জলপ্রপাতটির উৎস ল্যাংজোকুল হিমবাহ যেখান থেকে হাভিটা নদীর উৎপত্তি। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সূর্যের আলোকরশ্মি জলপ্রপাতের ওপর প্রতিফলিত হয় এবং রামধনুর বর্ণচ্ছটা পর্যটকদের বিমোহিত করে তোলে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে গুলফসের শোভা দেখে বাসে উঠে ঘণ্টা তিনেক পর হোটেলে ফিরে এলাম।
সেই রাতে হোটেলের বাসে করে আমাদের প্রথম অরোরা হান্ট। কিন্তু অরোরা হান্টে আর বেরতে হল না। অরোরা স্বয়ং হোটেল সংলগ্ন বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে ধরা দিল। রাত আটটায় ডিনার করে ডাইনিং রুম থেকে সবে বেরিয়েছি, রিসেপশনিস্ট ছেলেটি বলল, অরোরা দেখা যাচ্ছে। দৌড়ে কাচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে দেখি অন্ধকার আকাশে খুব হালকা সবুজাভ একটা আলো দেখা যাচ্ছে। কোথায় অরোরা? শুনলাম এটাই অরোরা, তবে এখনও পরিষ্কার নয়। শুরু হল প্রতীক্ষা।
রাত ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অরোরার ঘনত্ব বাড়ল না। মন খারাপ হয়ে গেল। ফিরে এলাম ঘরে। খাটের বাঁদিকে একটা বড় কাচের জানলা ছিল, আকাশের অনেকখানি দেখা যায়। পর্দা সরিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে শুয়ে আছি। ক্লান্ত শরীরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। রাত আড়াইটে নাগাদ ওয়েক আপ কলে চমকে উঠলাম। প্রথমেই চোখ চলে গেল জানলার দিকে। হ্যাঁ, দেখা যাচ্ছে। আহা! কী আনন্দ। হাতের সামনে রাখা পুলওভার কোনওরকমে গায়ে চাপিয়ে ছুটলাম রিসেপশনে। গিয়ে দেখি, আমাদের আগেই চাইনিজ আর জাপানি পর্যটকরা ট্রাইপড নিয়ে ছবি তুলছে। মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ পরিবেশ কোলাহল মুখরিত হয়ে উঠল। আহা! কী অপূর্ব দৃশ্য! জীবনে ভুলব না। মেঘমুক্ত তারায় ভরা ঝকঝকে আকাশের একটা স্ট্রিপ ধরে সবুজ একটা আলো আকাশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত জুড়ে বিরাজ করছে। কিন্তু স্থির। ভিডিওতে যে ডান্সিং অরোরা দেখি এটা সেরকম নয়। কিছুটা ছাড়া ছাড়া, টানা আলোর রেখা নয়। তবু তো অরোরা! যে স্বপ্ন ছোট থেকে মনের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় ছিল, তা আজ বাস্তব হল। আমাদের উত্তেজনা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। শুনলাম শেষ তিন সপ্তাহের মধ্যে আজই এতটা স্পষ্ট নর্দার্ন লাইটস (সুমেরু প্রভা) দেখা গেল। গত তিন সপ্তাহ আবহাওয়া অত্যন্ত খারাপ ছিল। প্রচণ্ড তুষারপাতে অরোরা দেখার সৌভাগ্য তখন কোনও পর্যটকের হয়নি। শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। নাই বা দেখলাম ডান্সিং অরোরা, যতটুকু দেখলাম আবহাওয়া খারাপ থাকলে তো সেটাও দেখতে পেতাম না। আইসল্যান্ডের যেখানে আমাদের হোটেল, সেই স্থানটির নাম হেলা। আমরা বাসসুদ্ধ লোক হেলাকে অবহেলা করেছিলাম। নর্দার্ন লাইটসের আসল স্পট ট্রমসো, অল্টা, হেমার ফেস্ট, কিরুনা দেখা তখনও আমাদের বাকি ছিল। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম হেলাই শেষ পর্যন্ত আমাদের মুখরক্ষা করেছে।
পরের দিন আইসল্যান্ডের দক্ষিণে অবস্থিত জোকুলসারলন গ্লেসিয়াল লেওন যাওয়া হল। আমার বহু আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্য এই গ্লেসিয়াল লেওন (আইসবার্গ দেখা যায়)। যা থেকে যেতে সময় লাগল পাঁচ ঘণ্টা। রাজধানী রেইকিয়াভিক থেকে ২৫৬ মাইল দূরে অবস্থিত। জোকুলসারলন যাওয়ার পথে দেখলাম আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে উদগত লাভা সবুজ হয়ে (মসকালার) বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। আর দেখলাম সমস্ত রাস্তা জুড়ে বিভিন্ন রক ফরমেশন— টানা জোকুলসারলন পর্যন্ত। প্রায় দুপুর একটার সময় জোকুলসারলন পৌঁছে প্রথমেই ‘ম্যাজেস্টিক’ শব্দটা আমার মুখ থেকে বেরল। সত্যিই ম্যাজেস্টিক!
ব্রেইডামারকুরজোকুল হিমবাহ থেকে বাহিত বিভিন্ন আকারের হিমবাহ সমস্ত লেওন জুড়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে। অপূর্ব তাদের ভাস্কর্য। সিঁড়ি দিয়ে নেমে লেওনের সামনে এসে জল স্পর্শ করা যায়। আমার ইচ্ছে ছিল হিমবাহকে ছুঁয়ে দেখার। ডানদিকে কিছু দূর যাওয়ার পর দেখলাম মোটা দড়ির বেষ্টনী। অর্থাৎ দড়ি টপকে গ্লেসিয়ার ছোঁয়ার কোনও উপায় নেই। লেওনের পাড় থেকেই তাই এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আকণ্ঠে পান করলাম।
আন্টার্কটিকা হয়তো কোনও দিন যেতে পারব না। কিন্তু হিমবাহ দেখার সাধ সাময়িকভাবে মিটিয়ে দিল জোকুলসারলন। এটি একটি প্রাকৃতিক বিস্ময়। এর রাজকীয় সৌন্দর্য বর্ণনা করা যায় না, শুধু দু’চোখ ভরে উপভোগ করতে হয়।
জোকুলসারলনের উল্টোদিকেই ঢিল ছোড়া দূরত্বে ডায়মন্ড বিচ। সমুদ্র সৈকতের বালির রং নিকষ কালো। সৈকত জুড়ে ছোট ছোট হিমবাহের খণ্ড ছড়িয়ে আছে। দেখলে মনে হয় রাশিকৃত হীরের খণ্ড কেউ যেন কালো বালির মধ্যে ছড়িয়ে রেখেছে। আকাশ কিছুটা মেঘলা থাকায় হীরকখণ্ডের ওপর সূর্যের আলোর প্রতিফলিত রূপের বাহার দেখা গেল না।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য স্কোগাফস জলপ্রপাত। স্কোগা নদী থেকে প্রপাতটি দুশো ফুট নীচে লাফিয়ে পড়ছে। ইংরেজি ফিল্ম ‘দ্য ডার্ক ওয়ার্ল্ড’, ‘থর’, ‘দ্য সিক্রেট লাইফ অব ওয়াল্টার মিট্টি’র শ্যুটিং হয়েছে স্কোগাফস ও তার নিকটবর্তী অংশে।
স্কোগাফসের পর গেলাম সেলজাল্যান্ডসফস জলপ্রপাত দেখতে। তুলনামূলকভাবে ক্ষীণকায়া। কিন্তু এর বৈশিষ্ট্য অন্য জায়গায়। জলপ্রপাতের পাশ দিয়ে সরু রাস্তা আছে, যা প্রপাতের পেছনে একটা ছোট্ট গুহায় নিয়ে যায়। এখান থেকে সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্য দেখার আকর্ষণে বহু পর্যটক আসে। জলপ্রপাতের জলীয় বাষ্প প্রবল ঝোড়ো হওয়ায় সারা শরীর ভিজিয়ে দেয়। এজেন্সির কথামতো রেনকোট নিয়ে যাওয়ায় ভিজতে হয়নি। সেখানে প্রবাহিত সেলজাল্যান্ডস নদী। নদীর দু’ধারে বিস্তৃত উপত্যকা জুড়ে হলুদাভ মস জাতীয় উদ্ভিদের আবরণ। প্রপাতের চারদিকে অসংখ্য সাদা বক জাতীয় পাখি মাছের লোভে উড়ে বেড়াচ্ছে।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য রেনিসফজারা বিচ, যা ব্ল্যাক বিচ নামে সারা বিশ্বে সুপ্রসিদ্ধ। বিচটি আইসল্যান্ডের দক্ষিণতম গ্রাম ভিক আই মিরডালের পাশে অবস্থিত। ব্ল্যাক বিচের নিকষ কালো পলিমিশ্রিত বালি প্রধানত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে উদ্গত ফুটন্ত লাভা দিয়ে তৈরি হয়েছে। রেনিসড্রাঙ্গার অত্যাশ্চর্য ব্যাসাল্টের স্তূপ এবং তার নীচেই হালসানেফপেলির গুহার জন্য ব্ল্যাক বিচ জগদ্বিখ্যাত। জলের তীব্র স্রোতের জন্য এখানে সমুদ্রে স্নান করা বিপজ্জনক। সৈকতের পূর্বদিকের ক্লিফগুলো থেকে যখন তখন রকফল হতে পারে। তাই এর ওপর উঠে ছবি না তোলাই ভালো।
পরের দিন আমরা গেলাম কিরকজুফেল। আইসল্যান্ডের পশ্চিমে অবস্থিত চার্চ মাউন্টেন নামে পরিচিত কিরকজুফেল আইসল্যান্ডের স্নিফেলনেস পেনিনসুলার উত্তর তীরে অবস্থিত। বেলেপাথর আর লাভা দিয়ে তৈরি এই পর্বতটি হাইকারদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় স্থান। অদূরে রয়েছে একটি জলপ্রপাত। সেখান থেকে নীচের মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
বিকেলে আমরা গেলাম রাজধানী রেইকিয়াভিক সিটি ট্যুরে। সঙ্গে ছিল একজন চীনা মহিলা গাইড। চীনের ইউহান প্রদেশে তার জন্ম। রেইকিয়াভিককে ‘বে অব স্মোক’ বা ধোঁয়ার উপসাগর বলা হয়। নরসম্যান ইঙ্গলফার আনরিসন রেইকিয়াভিকের প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এটি ছোট্ট ফিশিং ভিলেজ এবং বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। পরে রেইকিয়াভিককে পুর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল এবং ড্যানিশ শাসিত দ্বীপের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে মনোনীত করা হয়। রেইকিয়াভিক দক্ষিণ-পশ্চিম আইসল্যান্ডের ফাক্সাফ্লোই উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত। যা উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অংশ। রেইকিয়াভিকে মাত্র দেড় লক্ষ লোকের বসবাস। উষ্ণ প্রস্রবণের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা পরিষ্কার ও নিরাপদ এই শহর বিশ্বের সবচেয়ে উত্তরের রাজধানী। আইসল্যান্ড ভ্রমণ বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। রাস্তায় মহার্ঘ রেস্তরাঁর ছড়াছড়ি। অসাধারণ স্ট্রিট ফুড ও চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক প্রতি বছর আসে এখানে। আইসল্যান্ডের আদরের ডাকনাম ‘আগুন ও বরফের দেশ’।
আমাদের ডানদিকে নর্থ আটলান্টিক সমুদ্র। হাঁটতে হাঁটতে আমরা দেখলাম রেইকিয়াভিকের দর্শনীয় স্থানগুলি। সন্ধের মুখে গেলাম সিটি সেন্টার শপিং স্ট্রিটে স্যুভেনির কিনতে। সেরে নিলাম নৈশভোজ।
তারপরের দিন খুব ভোরে ব্রেকফাস্ট করে আইসল্যান্ডকে চির বিদায় জানিয়ে কেফলাভিক এয়ারপোর্ট পৌঁছলাম। দ্বিতীয় ভাগের ফিনল্যান্ড ভ্রমণের জন্য। সকাল সাড়ে সাতটায় ফিন এয়ারে উঠে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর স্থানীয় সময় দুপুর একটা নাগাদ হেলসিঙ্কি ভান্ডা এয়ারপোর্টে নামলাম। প্রথমেই গেলাম সিবেলিয়াস স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে। স্মৃতিস্তম্ভটি ১৯৬৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করা হয়েছিল। প্রায় ৬০০টি স্টিলের পাইপ দিয়ে তৈরি। এটি সিম্ফনির জন্য প্রসিদ্ধ। জিন সিবেলিয়াস ছিলেন রোমান্টিক যুগের শেষ দিকের একজন ফিনিশ সুরকার। এই মনুমেন্টের অদূরেই বাল্টিক সাগর।
বিকেলে প্যাকড ডিনার নিয়ে রওনা দিলাম হেলসিঙ্কি রেলওয়ে স্টেশনে সান্তাক্লজ এক্সপ্রেস চড়ে ফিনিশ ল্যাপল্যান্ডের অন্তর্গত রোভিনিয়েমির উদ্দেশে। এখানে ট্রেনের বর্ণনা না দিলেই নয়। ডবল ডেকার সাদা-সবুজ রঙের ট্রেন। স্লিপার কোচ। আমাদের রুম ছিল দোতলায়। অত্যন্ত সংকীর্ণ সিঁড়ি। চারখানা ভারী স্যুটকেস নিয়ে কোনওরকমে ওপরে উঠে দেখলাম অপ্রশস্ত লম্বা করিডরের বাঁদিকে পর পর স্লিপার কোচ, ডানদিকে টানা কাচের জানলা। ছোট্ট রুমে ঢুকে দেখলাম বাঙ্ক সিস্টেম। সরু অ্যালুমিনিয়ামের সিঁড়ি দিয়ে আপার বাঙ্কে ওঠা যায়। সিঁড়ির ঠিক সামনেই এক টুকরো টেবিল এবং বসার ছোট্ট টুল। তার পাশেই কাচের মাঝারি মাপের জানলা। বাথরুমটা এত ছোট বলার নয়। পাশেই একটা ক্লাচ। ক্লাচ ধরে টানলেই একটুকরো স্নানের জায়গা খুলে যায় যা মূল বাথরুম সংলগ্ন হয়েও আলাদা। কত স্বল্প পরিসরে কত কী যে করা যায় ভেবে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। শোবার জন্য নরম গদি, তুলতুলে বালিশ, গরম ব্ল্যাঙ্কেট, মাথার পাশেই মোবাইল চার্জ দেওয়ার জায়গা— সব মিলিয়ে অসামান্য অভিজ্ঞতা। জানলা দিয়ে চোখে পড়ল প্ল্যাটফর্মগুলো পুরু বরফের চাদরে মোড়া। টিকিট কাউন্টারের একদিকে স্তূপীকৃত বরফ। অনেক দূরে দূরে দু-একটা ছোট কটেজ। ভাবছিলাম, এই ধু ধু মেরুপ্রান্তরে এমার্জেন্সি হলে এরা কী করে? স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে সাতটায় ট্রেন রোভেনিয়েমি স্টেশনে পৌঁছল। সমস্ত স্টেশন বরফের চাদরে মোড়া।
স্থানীয় রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট করে আমরা পেলাম সান্তাক্লজ ভিলেজ। রোভেনিয়েমি সেন্টার থেকে আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সান্তাক্লজ ভিলেজে প্রবেশ করা মাত্র আমরা আর্কটিক সার্কেল (সুমেরু বৃত্ত) অতিক্রম করলাম। চারদিকের হোর্ডিং তার সাক্ষ্য বহন করছে। আক্ষরিক অর্থে তখন আমরা আনন্দে আত্মহারা।
সান্তাক্লজ ভিলেজ যাওয়ার আগে পথে পড়ল এক বিরাট ফ্রোজেন লেক। স্কি হচ্ছে সেখানে। এখানে আমরা স্নো মোবাইলে উঠলাম। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। আমরা পাঁচ লেয়ারের পোশাক পরেও ঠান্ডায় অস্থির হয়ে যাচ্ছি। মুখের অনাবৃত অংশ তখন বাস্তবিকভাবে অসাড়। অনেক ছবি তুললাম এখানে। বরফের পুরু আস্তরণে সমতল ও ফ্রোজেন লেক একাকার হয়ে গিয়েছে। এখানে ৪৫ মিনিট কাটিয়ে আমরা এলাম সান্তাক্লজ হলিডে ভিলেজে। ঘণ্টা দেড়েক সময় ধার্য করা হয়েছে। প্রথমে গেলাম ইনফরমেশন সেন্টারে। তারপর স্নোম্যানস ওয়ার্ল্ড। তারপর একে একে সান্তাক্লজ পোস্ট অফিস, রেনডিয়ার ভিলেজ, সান্তার মেইন সামার ভিলেজ দেখলাম। দূর থেকেও সান্তার ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। একটা এনক্লোজারের মধ্যে বসে আছে সান্তা, যা বাইরে থেকে পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। এরপর গেলাম সান্তাক্লজের ক্রিসমাস হাউসে। মনে হল ড্রিমল্যান্ডে প্রবেশ করলাম। এরপর এলাম সান্তার মূল কার্যালয়ে। ঘুরলাম আর্কটিক মলে।
সান্তাক্লজের মেন পোস্ট অফিস হল বিশ্বের একমাত্র পোস্ট অফিস যার নাম সান্তাক্লজ। প্রতিবছর হাজার হাজার চিঠি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছয়। এখান থেকে চিঠি লিখে ‘ডেইলি মেলে’ (ডাকবাক্স) ফেলে দিতে হয়। চিঠি লেখার জন্য বেশ কয়েকটা কাঠের টেবিল চেয়ার আছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের নামাঙ্কিত আলাদা আলাদা খোপে সেই চিঠি স্তূপের মতো জমা হয়। যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঠিকানায় এখান থেকে প্রেরিত হয়। আমাদের কলকাতার ঠিকানাতেও একটা চিঠি এসেছে। পৃথিবীর এত দেশ ঘুরেছি কিন্তু এরকম আশ্চর্য অভিনব ব্যাপার আর কোথাও দেখিনি।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সারিসেলকা রিসর্ট ভিলেজ। এখানেই ক্যাকসলট্যানেন ইস্ট ইগলু ভিলেজে আমাদের রাত্রিবাসের জন্য গ্লাস ইগলু বুক করা আছে। সারিসেলকা নর্দার্ন ফিনল্যান্ডে আর্কটিক সার্কেলের ২৬০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। সারিসেলকাতে দুশো কিলোমিটারের বেশি ক্রস কান্ট্রি ট্রেল আছে। তুষারাবৃত উরহো কাকোলেন ন্যাশনাল পার্ক হল স্কি করার স্বর্গরাজ্য। প্রথমে বলা হয়েছিল ক্যাকসলট্যানেন গ্লাস ইগলু ভিলেজে চেকইন করে আমরা প্ল্যানেটোরিয়াম দেখতে যাব। প্ল্যানেটোরিয়ামে বিকেল পাঁচটার পর প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। বাধ্য হয়ে চেকইন না করে প্ল্যানেটোরিয়াম দেখতে গেলাম। প্ল্যানেটোরিয়ামের মধ্যে একটি আর্ট গ্যালারি আছে, যা এককথায় অপূর্ব। এটি নর্দার্ন ইউরোপের বৃহত্তম প্ল্যানেটোরিয়াম। প্ল্যানেটোরিয়ামে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র দেখে বেরিয়ে লিফটে করে ওপরে উঠে অবজারভেটরি ডেক থেকে এক অসাধারণ সূর্যাস্ত দেখে নেমে এলাম।
ক্যাকসলট্যানেন ইস্ট ইগলু ভিলেজে পৌঁছলাম প্রায় সন্ধে সাতটায়। দু’টি লেনে আটটি করে মোট ষোলোটি ইগলু হোটেল। টিলার ওপর আরও দু’টি ইগলু। সর্বমোট ১৮টি ইগলু। আমাদের গ্লাস ইগলুর রুম নম্বর আট।
বৈজ্ঞানিক উপায়ে এমনভাবে তৈরি যাতে ইগলুর প্রবেশদ্বারের ওপরের অংশ ছাড়া কোথাও বরফ না জমে। ইগলুটি সেন্ট্রালি হিটেড। ভেতরে পাশাপাশি দু’টি আলাদা খাট। খাটের চারদিকে স্বল্প পরিসরে কোনওরকমে চারটে স্যুটকেস রাখা যায়। একদিকে একটা ছোট ফ্রিজ। ইগলুর ভেতরে চারদিকে টানা তাক আছে যাতে জিনিসপত্র রাখতে সুবিধে হয়। ঘরের চারদিকে মাত্র আধ ফুট উঁচু ধবধবে সাদা পর্দা টাঙানো, যাতে শুয়ে শুয়ে পর্যটকরা নর্দার্ন লাইটসের অপার্থিব সৌন্দর্য আস্বাদন করতে পারেন। ছোট্ট একটা বাথরুম। সেখানে আধুনিক সুযোগ সুবিধার সমস্ত ব্যবস্থা থাকলেও স্নান করা যাবে না, রিসেপশন থেকে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্নান ও সওনা বাথের জায়গা ইগলু থেকে অনেকটা দূরে রিসেপশনের কাছেই। বাথরুমের উল্টোদিকে ত্রিভুজাকৃতির একটা বসার জায়গা আছে। সেখানে চা-কফি খাওয়ার সরঞ্জাম সমেত একটা সুইচ বোর্ডের প্যানেল করা আছে। এখানে পর্দার কোনও আবরণ না থাকায় ইগলুর বাইরে জমে থাকা ৪ ফুট উঁচু বরফের প্রান্তর আর রাতের অন্ধকারে মাথার উপর অরোরার নৃত্য উপভোগ করা যায়।
রাত আটটায় ডিনার দিয়ে দিল। ন’টায় অরোরা হান্টিং এর জন্য বাস আসবে। দু’ ঘণ্টা ধরে চলবে এই মেরুজ্যোতির খোঁজ। আজও মেঘমুক্ত আকাশ। খোলা আকাশের অসংখ্য নক্ষত্রের আলো বরফের ওপর পড়ে সামান্য আলো সৃষ্টি করেছে। মারাত্মক ঠান্ডায় আমরা বাস থেকে নামার চেষ্টাই করিনি কেউ। হঠাৎ একটা ক্ষীণ সবুজ আলো আকাশে দেখা গেল। ড্রাইভার বাস থেকে নামতে বলল। বুঝলাম সময় আসন্ন প্রায়। কিন্তু হায়! আধ ঘণ্টা ওই ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থেকেও ক্ষীণ সবুজের রং আর গাঢ় হল না। আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। বাসে ফিরে এলাম। মনটা ক্রমেই দমে যাচ্ছে। বাসে ঠায় দেড় ঘণ্টা বসে রইলাম। কিন্তু যে ছবি আমরা ভিডিওতে দেখে অভ্যস্ত সেইরকম অরোরা আমাদের কাছে অধরাই থেকে গেল। ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন না হলে কি মনোবাসনা পূর্ণ হয়? ব্যর্থ মনোরথে গ্লাস ইগলুতে ফিরে এলাম।
ফিনিশ ল্যাপল্যান্ডকে বিদায় জানিয়ে আমরা নর্দার্ন নরওয়ের পথে যাত্রা করলাম। লফোটেন থেকে নর্থকেপের উপকূল ধরে এই যাত্রাপথ প্রায় সাত ঘণ্টার যাত্রা শেষে বাস এসে থামল অল্টা ক্যাথিড্রালের অদূরে। বাস থেকে ক্যাথিড্রালের দূরত্ব মিনিট সাত-আট। কিন্তু প্রচণ্ড বরফ পড়ার কারণে আমাদের যেতে সময় লাগল প্রায় কুড়ি মিনিট। চার্চের যিশু খ্রিস্টের মূর্তিটি একেবারে অন্যরকম।
পরের দিন হোটেল থেকে চেকআউট করে আমরা হ্যামারফেস্টের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। আবার দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়া। হ্যামারফেস্ট শুধু নরওয়ের উত্তরতম শহর নয়, এটি পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের শেষ শহর। জনসংখ্যা মাত্র দশ হাজার। অরোরা বোরিয়ালিস অর্থাৎ সুমেরুপ্রভা এবং মধ্যরাতের সূর্য দেখার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহর। হ্যামারফেস্ট দেখার ইচ্ছে আমার বহু বছরের। নির্দিষ্ট স্থানে বাস থামার পর আমরা অবিশ্রান্ত তুষারপাতের মধ্যে দিয়ে এগলাম হ্যামারফেস্টের শেষ পয়েন্ট দেখার জন্য। আমাদের ডানদিকেই সমুদ্রবন্দরে কয়েকটি জাহাজ নোঙর করা। আর্কটিক সার্কেলের বেশ কিছুটা ওপরে ৭০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে নর্থ সি-র কোল ঘেঁষা এই শহর। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। অত্যন্ত খারাপ আবহাওয়া। অঝোরে তুষারপাত হচ্ছে। তুষারপাতের আবরণ ভেদ করে চোখে পড়ল নীল-লাল পতাকা, পৃথিবীর শেষপ্রান্ত সীমা ঘোষণা করছে। তুষার দেশের এই ভ্রমণ আমার মনের মণিকোঠায় থেকে যাবে।